ধামরাইয়ে নীরব চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ, বিএনপি নেতার হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৯৭ বার
ধামরাইয়ে নীরব চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ কর্তৃপক্ষ,

প্রকাশ: ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

রাজধানীর উপকণ্ঠ ধামরাই শিল্পাঞ্চল হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত। দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখতে পোশাক কারখানাগুলো, বেসরকারি শিল্প প্রতিষ্ঠান, খাদ্য ও ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী মিলগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান ঘিরে এক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ধামরাইয়ের বিভিন্ন মিল ও ফ্যাক্টরি মালিকরা অভিযোগ করেছেন, এক শ্রেণীর ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে নীরব চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠান পরিচালনায় মারাত্মক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন তারা।

গোপন সূত্রে জানা গেছে, চাঁদাবাজরা সংগঠিত হয়ে প্রতিটি কারখানা থেকে নির্দিষ্ট অংকের টাকা দাবি করে থাকে। অনেক সময় তারা রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে ভয়ভীতি প্রদর্শন করছে। এতে মালিকপক্ষ চরম বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে। অভিযোগ উঠেছে, চাঁদার টাকা না দিলে কখনো শ্রমিক উস্কে দেওয়া হয়, কখনো উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এতে শিল্পাঞ্চলের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে।

এ অবস্থায় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও ধামরাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন প্রকাশ্যে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিএনপি কোনো চাঁদাবাজদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেবে না। সম্প্রতি বিভিন্ন সভা-সমাবেশে তিনি বারবার উল্লেখ করেছেন যে, বিএনপি’র নাম ভাঙিয়ে যারা গোপনে চাঁদাবাজি করছে, তাদের তালিকা দলের হাতে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “এ জঘন্য কাজে জড়িতরা দ্রুত থেমে যান, নাহলে তাদের পরিণাম হবে ভয়াবহ। আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন— কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীর দলে স্থান নেই।”

সম্প্রতি ধামরাই পৌরশহরের ভুলিভিটা এলাকায় অবস্থিত স্নোটেক্স নিটওয়ার কারখানায় বিএনপি নেতার নাম ভাঙিয়ে মোটা অংকের চাঁদা দাবি করা হয়। এ নিয়ে এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে বিএনপির আরেক নেতা শিমুল বিশ্বাস সেখানে সমাবেশ করেন এবং সন্ত্রাসীদের কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, বিএনপির নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে, তাকে কঠোর হাতে দমন করা হবে।

এ বিষয়ে আলহাজ্ব তমিজউদ্দিন আরও বলেন, “আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এসেছে যে, এক শ্রেণীর নেতাকর্মী দলের নাম ব্যবহার করে শিল্প মালিকদের কাছ থেকে চাঁদা নিচ্ছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। আমাদের দল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শে বিশ্বাসী। তাই কারও ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য দলের নাম ব্যবহার করে বেআইনি কার্যকলাপ চালানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”

শনিবার সরেজমিনে ধামরাই শিল্পাঞ্চল পরিদর্শনে গেলে বেশ কয়েকজন কারখানা প্রশাসনিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, “চাঁদাবাজি এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই নানা অজুহাতে টাকা দাবি করা হয়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, বিদেশি ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পাঠানো যাচ্ছে না। ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।”

তারা আরও জানান, “আমরা হাজার হাজার শ্রমিককে কর্মসংস্থান দিয়েছি। দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। অথচ কিছু চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছে। যদি এই অবস্থা অব্যাহত থাকে তবে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে, শ্রমিকরা কর্মহীন হবে। এতে শুধু আমাদের ক্ষতি হবে না, গোটা দেশ অর্থনৈতিকভাবে বড় ধাক্কা খাবে।”

এ বিষয়ে ধামরাই থানার অফিসার ইনচার্জ মো. মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, “কোনো চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীকে ছাড় দেওয়া হবে না। সে যে দলের রাজনীতি করুক না কেন, আমরা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবো। যদি কেউ মনে করে রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সে রেহাই পাবে, সেটা ভুল। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি অভিযোগ আমরা পেয়েছি। তদন্ত চলছে। প্রমাণ পেলেই দোষীদের গ্রেপ্তার করা হবে।”

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ধামরাইয়ে গড়ে ওঠা কারখানাগুলো শুধু স্থানীয় অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করছে না, কর্মসংস্থানের মাধ্যমে হাজার হাজার পরিবারকে বাঁচিয়ে রেখেছে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহিত হবে। এতে ভবিষ্যতে নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে না, বরং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোও ধ্বংস হয়ে যাবে। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।\

অর্থনীতিবিদরাও মনে করছেন, একটি শিল্পাঞ্চলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পুরো দেশের বিনিয়োগ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ অবস্থায় সরকার ও রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া জরুরি। শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকা নিরাপদ না হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরাও দ্বিধায় পড়বেন।

একইসঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি যদি ভবিষ্যতে নিজেদের বিকল্প সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তবে তাদের অবশ্যই দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে বেআইনি কর্মকাণ্ডকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। আলহাজ্ব তমিজউদ্দিনের বক্তব্য সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। তার এই স্পষ্ট অবস্থান বিএনপির ভেতর থেকে চাঁদাবাজদের চিহ্নিত করে দলকে শুদ্ধ করার প্রচেষ্টা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।

ধামরাইয়ের সাধারণ মানুষ এখন অপেক্ষা করছে, পুলিশ ও প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয় এবং বিএনপি নেতৃত্ব কতটা কার্যকরভাবে নিজেদের অবস্থান বাস্তবায়ন করতে পারে। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে চলতে থাকা নীরব চাঁদাবাজি কেবল শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, গোটা সমাজ ব্যবস্থাকেই অস্থির করে তুলছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত