প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে আগামী ২১ সেপ্টেম্বর রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এ সফরে তাঁর সঙ্গে থাকছেন দেশের তিনটি রাজনৈতিক দলের চারজন শীর্ষ নেতা, যা বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো একটি ভিন্নধর্মী দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। সাধারণত সরকারপ্রধানদের সফরসঙ্গী হয়ে থাকেন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রীরা কিংবা জ্যেষ্ঠ নেতারা, কিন্তু এবার প্রথমবারের মতো ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতারাও প্রতিনিধিদলের অংশ হচ্ছেন।
সফরসঙ্গী নেতারা হলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন। তাঁদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে আলোচনার ঝড় উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যেহেতু ভবিষ্যতে দেশের নেতৃত্ব রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকবে, তাই তাদের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্পৃক্ত করার এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
গতকাল বুধবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক ব্রিফিংয়ে প্রধান উপদেষ্টার পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন সংবাদমাধ্যমকে এসব তথ্য জানান। তিনি বলেন, অতীতে সরকারপ্রধানরা যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে যেতেন, তাঁদের প্রতিনিধি দলে থাকতেন কেবল মন্ত্রীরা এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা। এবারকার উদ্যোগটি আলাদা গুরুত্ব বহন করছে, কারণ এতে জাতীয় ঐক্য ও বহুমাত্রিক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও জানান, প্রধান উপদেষ্টা নিউইয়র্কে প্রায় ১০ দিন অবস্থান করবেন এবং ২ অক্টোবর দেশে ফিরবেন।
সফরকালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা। তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, গত বছরের সম্মেলনে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এবারও সে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। ইতোমধ্যে জাতিসংঘ মহাসচিব স্বয়ং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। পাশাপাশি আরও অনেক আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি সম্প্রতি ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন। ফলে এ সংকট সমাধানে নতুন করে আন্তর্জাতিক মহলের আগ্রহ ও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
তাছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বর প্রধান উপদেষ্টা জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেবেন। এ ভাষণে তিনি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক যাত্রার সাম্প্রতিক চিত্র তুলে ধরবেন। গত এক বছরে যে সব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, বিশেষ করে নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং নাগরিক অধিকারের প্রসারে গৃহীত পদক্ষেপগুলো আন্তর্জাতিক মহলের কাছে উপস্থাপন করবেন। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্ম ও যুবসমাজের প্রত্যাশা, তাদের অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও তুলে ধরা হবে বলে জানা গেছে।
তবে শুধু রাষ্ট্রীয় বিষয় নয়, কূটনৈতিক সম্পর্কও এ সফরে গুরুত্ব পাবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তৌহিদ হোসেন বলেন, এ ধরনের আন্তর্জাতিক আয়োজনে অনেক সময় নির্ধারিত বৈঠকের বাইরে আকস্মিকভাবে কিছু বৈঠক যুক্ত হয় আবার কিছু বাতিলও হয়ে যায়। প্রধান উপদেষ্টার যুক্তরাষ্ট্র সফরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কোনো বৈঠক হবে কিনা, সেটি এখনও নিশ্চিত নয়। তবে বিভিন্ন দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার বিদেশ সফরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আগাম প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সফরে সরকারের উপদেষ্টা মাহফুজ আলমকে নিয়ে কিছু বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নিউইয়র্কে গাড়িবহর ঘিরে ধরার ঘটনাও ঘটেছিল। বিষয়টি উল্লেখ করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, ওই ঘটনার জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। গাড়িটি যাতে আক্রান্ত না হয় তা নিশ্চিত করতে ভিন্ন নিরাপত্তা ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রতিবাদ বা মিছিল করলে পুলিশ সাধারণত বাধা দেয় না, তবে নাশকতা হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। তাই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো সম্ভব নয়, তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
জাতিসংঘ সফর উপলক্ষে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সঙ্গেই থাকছেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম, প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপ-প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার এবং জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রেস সচিব ফয়েজ আহম্মদ। তাঁরা প্রতিনিধি দলের সরকারি কার্যক্রমের সমন্বয় করবেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে এবারকার সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, অতীতে এ ধরনের সফরে শুধু ক্ষমতাসীন দলের লোকজনই জায়গা পেতেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে, রাজনৈতিক দলগুলোর অন্তর্ভুক্তি দেশীয় রাজনীতিতে একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এর মাধ্যমে দেশে অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে যাবে। একই সঙ্গে বিরোধী দলগুলোর নেতৃত্বও বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরার সুযোগ পাবে।
তবে সমালোচকরা মনে করছেন, এ উদ্যোগের পেছনে কৌশলগত কারণও রয়েছে। ক্ষমতাসীন না হয়েও বিরোধী দলের নেতাদের আন্তর্জাতিক সফরে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক সমঝোতার বার্তা দিচ্ছে। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে বিরোধী দলের সঙ্গে দ্বন্দ্ব প্রশমনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রধান উপদেষ্টার জাতিসংঘ সফর ঘিরে সাধারণ মানুষও আগ্রহী। বিশেষ করে রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান এবং দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর বক্তব্য শোনার অপেক্ষায় রয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। পাশাপাশি এ সফরে বাংলাদেশ কতটা আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায় করতে পারে, সেটিও নজর রাখছে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম।
সব মিলিয়ে বলা যায়, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের এ সফর শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সফর নয়, বরং বাংলাদেশে রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি, গণতন্ত্রের প্রসার ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের অবস্থান মজবুত করার একটি সুযোগ। আগামী ২৬ সেপ্টেম্বর তাঁর ভাষণ এবং প্রতিনিধি দলের কূটনৈতিক কার্যক্রম কীভাবে আন্তর্জাতিক মহল গ্রহণ করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এই সফর শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে নাকি কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকবে, তা নির্ভর করছে আগামী কয়েক দিনের কর্মকাণ্ড ও আলোচনার ফলাফলের ওপর।