গোলাপগঞ্জে ১৭ বছর পর বিএনপির গণমিছিল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৪৯ বার
গোলাপগঞ্জে ১৭ বছর পর বিএনপির গণমিছিল

প্রকাশ: ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সিলেটের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিনের নীরবতা ভেঙে নতুন করে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে বিএনপি। বিশেষ করে গোলাপগঞ্জে দলটির সক্রিয় উপস্থিতি যেন ফের আলোচনায় এসেছে। প্রায় ১৭ বছর ধরে দমন-পীড়ন, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও শাসক দলের সর্বগ্রাসী প্রভাবের কারণে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কোনো কর্মসূচি পালন করতে পারেননি। সভা-সমাবেশ দূরের কথা, তারা নীরবে দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে গেছেন কারও বাসায় কিংবা সীমিত পরিসরে। কিন্তু শনিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৫—এই দিনটিকে যেন পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে দেখছেন অনেকে। গোলাপগঞ্জ পৌর শহরে কয়েকশো নেতাকর্মীর অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বিএনপির গণমিছিল ছিল শুধু একটি কর্মসূচি নয়, বরং দলের তৃণমূল পর্যায়ে নতুন জাগরণের প্রতীক।

উপজেলা ও পৌর বিএনপির যৌথ আয়োজনে এই গণমিছিলে অংশ নেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এবং সিলেট-৬ (গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার) আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী। স্থানীয় নেতাদের ভাষ্যে, এই কর্মসূচি ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার পর দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তির এক নতুন নিঃশ্বাস।

মিছিল শেষে আয়োজিত পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, গত ১৭ বছর ধরে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার উন্নয়নের দিক থেকে অবহেলিত। সরকারের বৈষম্যমূলক নীতি, দুর্নীতি, অবকাঠামোগত অনিয়ম এবং সম্পদ পাচারের ফলে এ অঞ্চলের মানুষ ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, এলাকার রাস্তাঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক উন্নয়ন জরুরি হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, “আমাদের লক্ষ্য হবে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মসংস্থানমুখী শিল্পায়ন এবং প্রবাসী নির্ভর অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে এই অঞ্চলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা।”

তিনি আরও বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি দেশের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। এই কর্মসূচি শুধু ক্ষমতায় যাওয়ার পথনির্দেশ নয়, বরং জনগণের মুক্তি ও রাষ্ট্রের পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি। বক্তৃতায় তিনি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং বর্তমান ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের অবদানের কথা উল্লেখ করে বলেন, তাদের দূরদর্শী নেতৃত্বই বাংলাদেশকে আবারও আত্মনির্ভরতার পথে এগিয়ে নিতে সক্ষম।

মিছিলে অংশ নেওয়া কর্মীরা জানান, দীর্ঘদিনের নিস্তব্ধতার পর যখন তারা শত শত মানুষ একত্রিত হতে দেখেছেন, তখন মনে হয়েছে বিএনপি আবারো শক্ত অবস্থানে ফিরছে। একজন স্থানীয় নেতা বলেন, “আমরা এত বছর ধরে অন্ধকারে ছিলাম। আজকের দিনটা মনে হয়েছে যেন নতুন ভোর।”

উপজেলার ১১টি ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে আসা নেতাকর্মীদের অংশগ্রহণে মিছিলের রূপ ছিল বর্ণাঢ্য। স্লোগান আর ব্যানার-পোস্টারে মুখরিত হয়ে ওঠে পৌর শহরের প্রধান সড়কগুলো। তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীদের অংশগ্রহণে এই গণমিছিল গোলাপগঞ্জে বিএনপির পুনর্জাগরণের এক বাস্তব চিত্র এঁকে দেয়।

পথসভায় সভাপতিত্ব করেন পৌর বিএনপির সভাপতি মুশফিকুর রহমান মহি, আর অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান উজ্জল। সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির নেতা মহিউসসুন্নাহ চৌধুরী নার্জিস, সহ-মানবাধিকার সম্পাদক মিনহাজ আহমদ চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, নেতা এম সিরাজুল ইসলাম, আব্দুল জলিল ছাবু, সদর ইউনিয়নের সভাপতি কামরুল ইসলাম চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক আইনুল ইসলাম রেকলসহ একাধিক স্থানীয় নেতা।

এই কর্মসূচি শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশ নয়, বরং গোলাপগঞ্জের মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলেই স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি এখানে নিষ্ক্রিয় থাকলেও এই গণমিছিল প্রমাণ করেছে, সুযোগ পেলেই তারা রাজপথে ফিরে আসতে সক্ষম। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচনের আগে এ ধরনের কর্মসূচি দলকে আরও শক্তিশালী করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সিলেট-৬ আসনটি ঐতিহ্যগতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটি এলাকা। এখানে বিএনপির শক্তিশালী অবস্থান থাকলেও গত কয়েক দফা নির্বাচনে দলটি নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছে। ফলে এই গণমিছিলের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে বিএনপির সাংগঠনিক শক্তি আবারও দৃশ্যমান হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে উত্থিত এ উদ্দীপনা যদি জাতীয় পর্যায়ে প্রতিফলিত হয়, তবে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে শাসক দলের জন্য।

অন্যদিকে, শাসক দলের স্থানীয় নেতারা অবশ্য এই কর্মসূচিকে তেমন গুরুত্ব দিতে চান না। তাদের দাবি, জনগণ উন্নয়ন চায়, বিরোধী দলের স্লোগান নয়। তবে বাস্তবতা হলো, দীর্ঘ নীরবতার পর বিএনপি যেভাবে রাজপথে শক্তি প্রদর্শন করেছে, তা নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, গোলাপগঞ্জে ১৭ বছর পর বিএনপির এই গণমিছিল ছিল কেবল একটি সমাবেশ নয়, বরং দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ, বঞ্চনা আর প্রত্যাশার বহিঃপ্রকাশ। আগামী জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে এ ধরনের কর্মসূচি শুধু স্থানীয় নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। বিএনপি যদি এই ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারে, তবে গোলাপগঞ্জ ও বিয়ানীবাজারের মতো এলাকাগুলো ভবিষ্যতে দলের জন্য একটি শক্তিশালী ঘাঁটিতে পরিণত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত