সিআইএ পরিচয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬৫ বার

প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত নাগরিক এনায়েত করিম চৌধুরী, যিনি নিজেকে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর এজেন্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। পুলিশি রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তিনি যে তথ্য দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তার দাবি অনুযায়ী, তিনি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর সঙ্গে দীর্ঘ সাত বছর ধরে যোগাযোগ রেখে আসছেন এবং দেশে আসার প্রতিবারই রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতেন। যদিও এই দাবির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এনায়েত যে তথ্য দিয়েছেন, সেগুলো যাচাই করে কিছু অংশকে সত্য বলে প্রমাণিত করা সম্ভব হয়েছে।

রিমান্ডে এনায়েত করিম স্বীকার করেছেন, তিনি সম্প্রতি দেশে ফিরে বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, সেনাসমর্থিত একটি অন্তর্বর্তী সরকার শিগগিরই গঠিত হতে যাচ্ছে, এবং এই সরকারের উপদেষ্টামণ্ডলীতে যোগদানের সুযোগ করে দিতে পারবেন। এই প্রলোভন দেখিয়ে তিনি আর্থিক সুবিধাও নিয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তদন্তে জানা গেছে, অন্তত এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে তিনি ২০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

তদন্তকারী কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এনায়েত করিম যুক্তরাষ্ট্র থেকে হোয়াটসঅ্যাপ এবং অন্যান্য অনলাইন মাধ্যমে তার সহযোগীদের কাছে বিভ্রান্তিমূলক বার্তা পাঠাতেন। এই বার্তাগুলো বিভিন্ন মহলে ছড়িয়ে দিয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালানো হতো। তার অন্যতম প্রচার ছিল যে দেশে একটি জাতীয় সরকার গঠন হতে যাচ্ছে, যেখানে সব মত ও পথের মানুষ অংশ নেবে।

এনায়েত করিমের সঙ্গে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খানের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ ছিল। আমেরিকায় থাকা অবস্থায় তাদের মধ্যে নিয়মিত কথা হতো, এবং দেশে ফেরার পর তিনি আবু আলমসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, তিন মাস আগে এনায়েতের পরামর্শে আবু আলম রাজধানীর ইস্কাটনে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নেন, যা পরবর্তীতে সরকারবিরোধী তৎপরতার জন্য ব্যবহার করা হয়।

রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এনায়েত করিমের সংশ্লিষ্টতা নিয়েও নতুন তথ্য উঠে এসেছে। জানা গেছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গঠিত “আম জনতার পার্টি”-তে তিনি ৫০ লাখ টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছেন বলে দাবি করেছেন। এর কিছুদিন পরই আরেকটি নতুন রাজনৈতিক দল “জনতা পার্টি বাংলাদেশ”-এর পেছনেও তিনি সমপরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন। শুধু তাই নয়, ওই দলের আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানের সমস্ত ব্যয়ভারও তিনি বহন করেন। তদন্ত কর্মকর্তারা বলছেন, এ কার্যক্রমের মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক শক্তি তৈরি করে প্রভাব বিস্তার করতে চেয়েছেন।

অন্যদিকে, এনায়েত করিমের সঙ্গে নাজমুল আহসান কলিমুল্লাহ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্যেরও যোগাযোগ ছিল বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। প্রায় ১২ বছর আগে এক কূটনৈতিক অনুষ্ঠানে তাদের পরিচয় হয় এবং এরপর থেকেই সম্পর্ক গড়ে ওঠে। কলিমুল্লাহ তার কাছ থেকে তথ্য পেতেন এবং মাঝে মাঝে টকশোতেও সেই তথ্য ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তদন্তে আরো জানা গেছে, জাতীয় পার্টির একজন নেতা এবং আরেকটি নতুন দলের প্রধান এনায়েত করিমের সঙ্গে দেখা করেছেন। তবে তারা অর্থ লেনদেনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। পুলিশ বলছে, এই তথ্যগুলো যাচাই করা হচ্ছে এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এনায়েত করিমের অতীতও বিতর্কিত। ১৯৮৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে গমন করার পর তিনি ২০০৪ সালে মার্কিন নাগরিকত্ব লাভ করেন। বর্তমানে তিনি পরিবারসহ পেনসিলভানিয়ায় বসবাস করেন এবং সেখানেই মুদি দোকান ও গরুর খামারের ব্যবসা চালান। তবে এটাই প্রথম নয়, আগেও জোট সরকারের সময় চট্টগ্রাম বিমানবন্দরে প্রতারণার দায়ে তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

তার কার্যকলাপ নিয়ে সরকারের একাধিক নিরাপত্তা সংস্থা ধারণা করছে, তিনি আরেকটি ওয়ান ইলেভেন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সক্রিয় ছিলেন। তার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা করা হচ্ছিল। পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনেরও প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে, বর্তমানে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের আস্থা থাকায় এনায়েতের এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।

সম্প্রতি মার্কিন দূতাবাসের দুই কর্মকর্তা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, যেখানে এনায়েত করিম প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। যদিও বৈঠকের বিস্তারিত জানা যায়নি, তবে কূটনৈতিক মহল বলছে, বিষয়টি আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ এনায়েত শুধু নিজেকে সিআইএ এজেন্ট বলেই পরিচয় দেননি, বরং তিনি দক্ষিণ এশীয় পরিচালকের ভুয়া পরিচয়ও ব্যবহার করেছেন।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এনায়েতের বিরুদ্ধে আরও তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই তার বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেন, প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। তার রিমান্ড শেষে নতুন করে আরও তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

এনায়েত করিমের ঘটনাটি শুধু একটি প্রতারণা বা আর্থিক লেনদেনের মামলা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন ধরণের ষড়যন্ত্রের দিক নির্দেশ করছে। আন্তর্জাতিক সংযোগ, ভুয়া পরিচয়, রাজনৈতিক ফান্ডিং এবং বিভ্রান্তিমূলক প্রচারের মাধ্যমে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্টের চেষ্টা—সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি একটি বড় ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ওয়ান ইলেভেনের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা নিয়ে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছিল। এনায়েত করিমের স্বীকারোক্তি এবং তার অর্থনৈতিক সহায়তায় গঠিত নতুন দলগুলোর কর্মকাণ্ড সেই আশঙ্কাকেই আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই ঘটনাকে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত