মালয়েশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৬২ বার
মালয়েশিয়া সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

মালয়েশিয়ায় অনুষ্ঠিত ইন্দো-প্যাসিফিক আর্মি চিফস্ কনফারেন্স (আইপিএসিসি) শেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশে ফিরেছেন। শুক্রবার গভীর রাতে তিনি ঢাকায় এসে পৌঁছান। আজ শনিবার সকালে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এই সফর শুধু একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং এটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কূটনৈতিক ও কৌশলগত ভূমিকার একটি শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ হয়ে উঠেছে।

২৩ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে অনুষ্ঠিত হয় আইপিএসিসি সম্মেলন। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের সেনাপ্রধানদের সমন্বয়ে আয়োজিত এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেয় বহু দেশের উচ্চপদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ও প্রতিনিধি। বৈঠকের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা। বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্ব বহনকারী ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে সাম্প্রতিক সময়ে যে ধরনের ভূরাজনৈতিক জটিলতা তৈরি হয়েছে, সেগুলো মোকাবিলায় সেনাপ্রধানদের অভিন্ন অবস্থান ও যৌথ পদক্ষেপ গ্রহণ নিয়ে আলোচনা হয় সম্মেলনে।

বাংলাদেশ সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন অত্যন্ত স্পষ্ট ও দূরদর্শী দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিযোগিতা নয় বরং অংশীদারিত্ব ও সহযোগিতাই বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর পথ। জলবায়ু পরিবর্তন, সন্ত্রাসবাদ, মানবপাচার, মাদক ব্যবসা কিংবা আঞ্চলিক সংঘাত—এসব জটিল সমস্যার সমাধান কোনো একক দেশের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সেনাপ্রধান জোর দেন পারস্পরিক আস্থা, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও পেশাদারিত্বের ওপর ভিত্তি করে সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচনের প্রতি।

তিনি বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সবসময় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান বিশ্বের কাছে সুপরিচিত, আর এই অভিজ্ঞতাই প্রমাণ করে যে মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গড়ে তোলা সহযোগিতা দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর হতে পারে।

সম্মেলন চলাকালে সেনাপ্রধান যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি প্যাসিফিক কমান্ডের কমান্ডিং জেনারেল রোনাল্ড প্যাট্রিক ক্লার্ক এবং মালয়েশিয়ার সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল টান সেরি দাতো সেরি মুহাম্মাদ হাফিজউদ্দিন জানতানের সঙ্গে পৃথকভাবে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। এসব বৈঠকে আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল বহুমুখী। বিশেষভাবে আলোচিত হয় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, পেশাগত উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়ন, প্রতিরক্ষা উৎপাদনে প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং যৌথ মহড়া আয়োজনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতেও আলোকপাত করেন সেনাপ্রধান। তিনি আন্তর্জাতিক মহলের সহযোগিতা চান এই দীর্ঘমেয়াদি সংকট সমাধানে।

সাক্ষাৎকারে আরও গুরুত্ব পায় বৈশ্বিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং সামরিক প্রশিক্ষণে নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কার্যক্রমে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে এসব সহযোগিতা আগামীতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এ সফর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য কেবল সামরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি এক ধরনের কূটনৈতিক উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এখন একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী অবস্থান তৈরি করতে চায়, আর আন্তর্জাতিক এসব সম্মেলন সেই অবস্থানকে আরও দৃঢ় করছে। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সফর তাই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার পাশাপাশি বাংলাদেশের কৌশলগত ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতেও সহায়তা করেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এখন বিশ্ব রাজনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার এলাকা। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, জাপানসহ বিভিন্ন পরাশক্তি এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারে তৎপর। ফলে ছোট দেশগুলোও কৌশলগত কারণে এই অঞ্চলে গুরুত্ব পাচ্ছে। বাংলাদেশ তার ভৌগোলিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কারণে এ অঞ্চলে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় রয়েছে। সেনাপ্রধানের এই সফর সেই ভূমিকাকে আরও সুস্পষ্ট করেছে।

সফরের সময় বাংলাদেশ সেনাপ্রধান যে বার্তা দিয়েছেন, তা হলো আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কোনো প্রতিযোগিতার পক্ষপাতী নয়, বরং সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে চায়। এর মাধ্যমে শুধু সামরিক শক্তির প্রদর্শন নয়, বরং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শান্তির বার্তাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। এতে বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান গত ২২ সেপ্টেম্বর সরকারি সফরে মালয়েশিয়া যান। চার দিনের এ সফর শেষে শুক্রবার রাতে তিনি ঢাকায় ফিরেছেন। এ ধরনের সফর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও অংশীদারিত্ব আরও জোরদার করবে এবং ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একে প্রস্তুত করতে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com