জামায়াত ক্ষমতায় এলে দাবি আদায়ে জনগণকে রাস্তায় নামতে হবে না: শফিকুর রহমান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৯ বার
ক্ষমতায় এলে সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশ পরিচালনা করবে জামায়াত

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গনে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বক্তব্য, প্রতিশ্রুতি এবং সমালোচনার ঢেউ ওঠে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আবারও রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান এক বক্তব্যে দাবি করেছেন, জামায়াত যদি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে, তাহলে জনগণকে নিজেদের দাবি আদায়ে আর কখনো রাস্তায় নামতে হবে না। রাজধানীর ফোরাম অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (এফডিইবি)-এর বার্ষিক কাউন্সিল অধিবেশনে তিনি এ বক্তব্য দেন।

ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, বাংলাদেশের ইতিহাসে দাবি-দাওয়া বাস্তবায়নের জন্য জনগণ প্রায়ই রাজপথে নেমেছে। শ্রমিক আন্দোলন, ছাত্র আন্দোলন, গণআন্দোলন থেকে শুরু করে গণতান্ত্রিক আন্দোলন—সবকিছুতেই রাজপথ ছিল প্রধান মাধ্যম। এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতের আমিরের বক্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

ট্রাম্প-এর্দোগান বৈঠক: ২৫ সেপ্টেম্বর হোয়াইট হাউসে

তিনি বলেন, দেশের অতীত সরকারগুলো অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতায় থেকেও জনগণের সমস্যার সমাধান করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের জন্য কর্মসংস্থানের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। অথচ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদই হচ্ছে তরুণ সমাজ। তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে দেশ নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে। তাঁর দাবি, জামায়াত জনগণের সহযোগিতায় একটি ঘুণে ধরা বাংলাদেশকে নতুন করে গড়ে তুলতে চায়।

শিক্ষাব্যবস্থার চরম দুরবস্থার কথাও তিনি এ সময় তুলে ধরেন। তাঁর অভিযোগ, যারা শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের সন্তানরা বিদেশে পড়াশোনা করেন। ফলে দেশের শিক্ষা খাতের বাস্তব সমস্যাগুলির প্রতি তাঁদের দায়বদ্ধতা নেই। এ কারণেই দেশের শিক্ষা খাত বারবার নাজুক অবস্থায় পড়ছে। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে এমন শিক্ষা আর দেওয়া হবে না, যা মানুষকে পিছিয়ে দেয় কিংবা দুর্নীতিবাজ ও অমানবিক করে তোলে। বরং এমন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে, যা মানুষকে সত্যিকারের মানুষ বানাবে, মানবিক মূল্যবোধ শেখাবে এবং অন্যকে সম্মান করার শিক্ষা দেবে।

তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেন, দেশের ভাঙাচোরা শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কার করা হবে। শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিক ও বৈষয়িক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় আনা হবে। এর ফলে শিক্ষাজীবন শেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ পাবে। কেউ বেকার থাকবে না; কেউ উদ্যোক্তা হবে, কেউ চাকরিজীবী। এ ছাড়া শুধু ডিগ্রির ভিত্তিতে কারও মর্যাদা নির্ধারণ করা হবে না, বরং কাজের দক্ষতা ও ফলাফলের ওপর ভিত্তি করেই মর্যাদা দেওয়া হবে।

দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, “আমরা জানি, পাঁচ বছরে উন্নয়নের বুলেট ট্রেন চালানো সম্ভব নয়, তবে উন্নয়নের এক্সপ্রেস ট্রেন অবশ্যই চালু করা যাবে।” তাঁর মতে, উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ। তিনি বলেন, ক্ষমতায় গেলে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে। এমনকি সরকারের সমালোচনা হলেও তা প্রকাশের সুযোগ থাকবে। তাঁর মতে, সাংবাদিকদের সাহসিকতা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে।

দুর্নীতিবিরোধী অঙ্গীকার নিয়েও তিনি দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা দুর্নীতির প্রবাহ বন্ধ করব। এটা শুনে অনেকের হৃদয় ধড়ফড় করছে, কারণ অনেকেই এভাবেই চলেন। তবে যে সার্ভিসের গভীরতা ও দায়িত্ব যতটা, সেই অনুযায়ীই বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হবে।” তাঁর বক্তব্যে বোঝা যায়, তিনি দুর্নীতির মূলোৎপাটনকে জামায়াতের প্রধান এজেন্ডার একটি হিসেবে তুলে ধরতে চান।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের আমিরের এই বক্তব্য শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়, বরং দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশলেরও ইঙ্গিত বহন করছে। কারণ, বাংলাদেশে জনগণের দাবিগুলো পূরণের জন্য রাজপথের আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক ধারা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী গণআন্দোলন পর্যন্ত সব ক্ষেত্রেই জনগণ রাজপথকে ব্যবহার করেছে। এমন প্রেক্ষাপটে জনগণকে রাজপথে নামতে হবে না বলে ঘোষণা করা একধরনের রাজনৈতিক বার্তা, যা দিয়ে জামায়াত জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাইছে যে তাদের নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক দাবি শান্তিপূর্ণ ও প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে মীমাংসা হবে।

অন্যদিকে সমালোচকরা বলছেন, জামায়াতের অতীত ইতিহাস এবং রাজনৈতিক ভূমিকা এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা সাধারণ মানুষের মনে এখনো বিতর্কিত। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে দলটি দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে। এমন পরিস্থিতিতে জনগণের আস্থা অর্জন জামায়াতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের এমন বক্তব্য নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সোশ্যাল মিডিয়াতেও শফিকুর রহমানের এই বক্তব্য নিয়ে তুমুল আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বলছেন, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় আসার আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেয়, সেগুলির বাস্তবায়ন খুব কমই হয়। কাজেই জামায়াতের প্রতিশ্রুতির ক্ষেত্রেও জনগণকে সতর্ক থাকতে হবে। আবার অন্যদিকে জামায়াত সমর্থকরা মনে করছেন, দেশের বিদ্যমান সংকট থেকে মুক্তি পেতে হলে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি দরকার, এবং জামায়াত সেই ভূমিকা রাখতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরাও বাংলাদেশে জামায়াতের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকে নজর রাখছেন। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ইসলামপন্থী দলগুলির ভূমিকা সবসময় আলোচনার বিষয় হয়ে এসেছে। তাই জামায়াতের এই বক্তব্য কেবল দেশীয় রাজনীতিতেই নয়, আঞ্চলিক রাজনীতিতেও গুরুত্ব পাচ্ছে।

সবশেষে বলা যায়, জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য জনগণকে নতুন এক রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সামনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এটি কতটা বাস্তবায়নযোগ্য এবং জনগণের আস্থা অর্জনে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে। বাংলাদেশি রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি নতুন কিছু নয়, কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়নের পথই আসল পরীক্ষার জায়গা। জনগণ অপেক্ষা করবে দেখতে, জামায়াত শুধু প্রতিশ্রুতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে, নাকি সত্যিই একটি “ঘুণে ধরা বাংলাদেশকে” নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত