সুসংগঠিত হলেও জামায়াতের পক্ষে ভোটে জেতা সম্ভব নয়: মির্জা ফখরুল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
মির্জা ফখরুলের সঙ্গে আইআরআই প্রতিনিধি দলের বৈঠক

প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নাটকীয় পরিবর্তন ঘটেছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে বিরোধী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা বিএনপি এখন ভিন্ন এক বাস্তবতায় পড়েছে। ক্ষমতার বাইরে থাকা আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ায় এবং জাতীয় পার্টি প্রায় নিশ্চুপ হয়ে যাওয়ায় দেশের রাজনীতির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হিসেবে বিএনপির সামনে এসেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। কিন্তু জামায়াত যতই সুসংগঠিত হোক না কেন, জনগণের ভোটে জয় পাওয়া তাদের জন্য সহজ হবে না বলে মনে করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

গত শুক্রবার (২৬ সেপ্টেম্বর) স্থানীয় সময় নিউইয়র্কে অবস্থানকালে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে মির্জা ফখরুল এই মন্তব্য করেন। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর জামায়াত যে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে তা স্বীকার করলেও তিনি মনে করেন, এ দলটির জনপ্রিয়তা নিয়ে অনেক বেশি প্রত্যাশা করার সুযোগ নেই। তার ভাষ্যে, “জামায়াত যেভাবেই হোক লাইম লাইটে এসেছে। মিডিয়া কাভারেজ এবং সাংগঠনিক তৎপরতার মাধ্যমে তারা চেষ্টা করছে জায়গা করে নিতে। তবে জনগণের মধ্যে তাদের প্রভাব অতটা বিস্তৃত নয়। আমি মাঠের রাজনীতি করি, মানুষের সঙ্গে যাতায়াত করি, বোঝা যায়—সেই প্রভাবটা খুব বেশি নেই।”

বিএনপি মহাসচিব এ সময় স্বীকার করেন যে জামায়াতের অন্যতম শক্তি হলো তাদের সাংগঠনিক কাঠামো। তিনি বলেন, “জামায়াতের সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে তাদের শক্তিশালী সংগঠন। তারা শৃঙ্খলাপরায়ণ একটি রাজনৈতিক দল এবং তাদের কাছে পর্যাপ্ত তহবিলও আছে। এই দিকগুলো নিঃসন্দেহে তাদের জন্য ইতিবাচক।” তবে ফখরুলের মতে, সাংগঠনিক শক্তি থাকা মানেই যে ভোটের মাঠে সাফল্য নিশ্চিত, তা নয়। “জনগণের কাছে গিয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করা তাদের জন্য সহজ হবে না। সুসংগঠিত হলেও এর মানে এই নয় যে জনগণ ভোট দিয়ে তাদের নির্বাচিত করবে,” বলেন তিনি।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নিষেধাজ্ঞা এবং জাতীয় পার্টির প্রায় নিশ্চুপ অবস্থানের কারণে আপাতদৃষ্টিতে জামায়াত এক ধরনের সুবিধাজনক অবস্থানে এসেছে। কিন্তু গণমানুষের সঙ্গে যোগসূত্র তৈরি করা ছাড়া কোনো রাজনৈতিক দল দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে পারে না। তার মতে, জামায়াতের জনপ্রিয়তার সীমাবদ্ধতাই ভবিষ্যতে তাদের বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।

তিনি আরও বলেন, “গোটা পৃথিবীর মতো বাংলাদেশেও ডানপন্থি রাজনীতির উত্থানের চেষ্টা চলছে। বৈশ্বিক রাজনীতির দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই, দক্ষিণ এশিয়া থেকে ইউরোপ কিংবা আমেরিকা—সব জায়গাতেই ডানপন্থি শক্তিগুলো নতুনভাবে সক্রিয় হচ্ছে। বাংলাদেশও এই প্রবণতা থেকে আলাদা নয়। তবে বাংলাদেশের সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন। এখানে কেবল সংগঠন বা অর্থনৈতিক শক্তি দিয়ে জনগণের মন জয় করা যায় না। তাই ভোটের মাঠে এ ধরনের ডানপন্থি উত্থান সফল হবে বলে আমি মনে করি না।”

জামায়াতের অবস্থান প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিবের এই মন্তব্য এসেছে এমন এক সময়ে যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দলটি বিভিন্ন মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াতের তৎপরতা বেড়েছে, পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের মাধ্যমে নতুন করে জনসম্পৃক্ততার চেষ্টা করছে তারা। এর ফলে রাজনীতির মাঠে তাদের দৃশ্যমানতা অনেকটাই বেড়েছে। তবে দৃশ্যমানতা আর গ্রহণযোগ্যতার মধ্যে বড় পার্থক্য আছে বলে মনে করেন ফখরুল। তার মতে, জনগণ এখনও জামায়াতকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় আনার মতো আস্থাভাজন মনে করছে না।

আলোচনায় তারেক রহমানের প্রসঙ্গও আসে। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন। তার দেশে ফেরার সময়সূচি নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও মির্জা ফখরুল জানান, “তারেক রহমান সময়মতোই দেশে ফিরবেন। দল ও দেশের স্বার্থেই তিনি সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।” এ সময় তিনি বিএনপির ভেতরকার নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক প্রস্তুতির দিকেও ইঙ্গিত দেন, যা আসন্ন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। কারণ দীর্ঘদিন ধরেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব নিয়ে নানা গুঞ্জন ছিল। বিশেষ করে নির্বাচনী কৌশল ও জুলাই সনদের বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতের অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হয়েছে। যেখানে বিএনপি সংস্কার ও সমঝোতার মাধ্যমে এগোতে চায়, সেখানে জামায়াত তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। ফলে এই দুই দলের মধ্যে দূরত্ব আরও স্পষ্ট হচ্ছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে জামায়াতের ভূমিকা বরাবরই বিতর্কিত। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা থেকে শুরু করে পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসে তাদের অবস্থান নিয়ে নানা সমালোচনা আছে। সেই প্রেক্ষাপটে আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় তারা সুসংগঠিত হলেও ভোটে জেতার সম্ভাবনা সীমিত—ফখরুলের মন্তব্য সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে।

এদিকে মাঠপর্যায়ে বিএনপির অবস্থানও অনেক চ্যালেঞ্জের মুখে। দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি যেমন পরিবর্তিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি তেমনিভাবে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার দিকে নিবদ্ধ। রাজনৈতিক দলগুলোর অবস্থান, গণমানুষের সমর্থন এবং নির্বাচনের পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়েই আগামী দিনের রাজনীতির চিত্র নির্ধারিত হবে। এই প্রেক্ষাপটে ফখরুলের বক্তব্য স্পষ্টভাবে বিএনপির কৌশল ও দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করছে।

মির্জা ফখরুলের মতে, “বাংলাদেশে যে কোনো রাজনৈতিক শক্তিকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। কেবল শক্তিশালী সংগঠন দিয়ে ভোটে জেতা যায় না। জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা এবং বিশ্বাস অর্জনই আসল বিষয়।” তার বক্তব্যে স্পষ্ট যে বিএনপি এখনো মনে করে, রাজনীতির মূল শক্তি হলো সাধারণ মানুষ এবং তাদের সমর্থন ছাড়া কোনো দল টিকতে পারবে না।

অতএব, ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির চিত্র অনেকটাই নতুন। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জাতীয় পার্টির সীমিত ভূমিকা এবং জামায়াতের নতুন করে আলোচনায় আসা—সব মিলিয়ে বিএনপির জন্য এখন এক জটিল কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সময়। তবে মির্জা ফখরুলের বক্তব্য থেকে এটা পরিষ্কার যে বিএনপি জামায়াতকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখছে, তবে তাদের ভোটে জেতার সম্ভাবনা নিয়ে সন্দিহান।

 

বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি কোন পথে যাবে, তা এখনই বলা কঠিন। তবে ফখরুলের বিশ্লেষণ স্পষ্ট করছে যে, সংগঠন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণের আস্থা ছাড়া কোনো দল ক্ষমতার মসনদে আসতে পারবে না।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত