বিএনপির কাছে শতাধিক আসন নিয়ে সমমনা দলগুলোর দর-কষাকষি

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
একই দিনে ভোট ও গণভোট: ইসির সামনে কঠিন চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘোষিত সময় অনুযায়ী আগামী ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে ভোট অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এবং নভেম্বরের মাঝামাঝিতেই তফসিল ঘোষণার কথা রয়েছে। সেই হিসেবে আর মাত্র কয়েক মাস হাতে থাকায় রাজনৈতিক দলগুলো প্রার্থী নির্ধারণ, জোট গঠন ও কৌশল ঠিক করতে এখন ব্যস্ত সময় পার করছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যেই প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করেছে এবং পাশাপাশি শরিক ও সমমনা দলগুলোর সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনায় বসেছে।

সূত্রমতে, সমমনা দলগুলো বিএনপির কাছে শতাধিক আসন দাবি করেছে, যা নিয়ে চলছে জোরালো দরকষাকষি ও আলোচনার পর্ব। জানা গেছে, গণতন্ত্র মঞ্চ একাই দাবি করেছে ৫০টি আসন। লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) চায় অন্তত ১৫টি আসন। দলটির মহাসচিব রেদোয়ান আহমেদ ইতিমধ্যেই লন্ডনে গেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে আলোচনায় বসতে। অন্যদিকে ১২ দলীয় জোট ২০টি আসনের দাবি তুলেছে, আর জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট চাইছে ৯টি আসন। এ ছাড়া আরও কয়েকটি দল তাদের তালিকা তৈরি করে বিএনপির হাতে তুলে দিয়েছে এবং কেউ কেউ মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়ে আগাম প্রচারণাও শুরু করেছে।

এই আসন বণ্টন নিয়ে জটিলতা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কারণ বিএনপিকে নিজস্ব প্রার্থীদেরও অগ্রাধিকার দিতে হচ্ছে, আবার আন্দোলনে একসঙ্গে থাকা শরিকদের হতাশ না করতেও হচ্ছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এক প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, বিএনপি এমন আসনেই শরিকদের প্রার্থী দেবে, যেখানে তাদের জয়লাভের বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা রয়েছে। দলের কৌশল অনুযায়ী শরিকদের আসন বণ্টনে জয় নিশ্চিত করাই হবে প্রধান বিবেচনা।

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের মতে, প্রার্থী চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া এ মাসের মধ্যেই শেষ করতে হবে। কেননা তফসিল ঘোষণার পর আর প্রার্থীদের নিয়ে দীর্ঘ আলোচনার সুযোগ থাকবে না। তাই শরিকদের সঙ্গে আসন ভাগাভাগির আলোচনা এখন একপ্রকার চূড়ান্ত পর্বে গড়িয়েছে। তবে সব দলের দাবি পূরণ করা সম্ভব নয় বলে দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টন নিয়ে তৈরি হওয়া চাপ সামলানো। শরিকরা যদি পর্যাপ্ত আসন না পান, তবে নির্বাচনে তাদের মনোবল নষ্ট হতে পারে কিংবা তারা স্বাধীনভাবে লড়ার পথও বেছে নিতে পারেন। আবার অন্যদিকে শরিকদের বেশি আসন দিলে বিএনপির নিজস্ব প্রার্থীদের অসন্তোষ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। ফলে আসন বণ্টনের ক্ষেত্রে বিএনপিকে সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “আমরা আন্দোলনে বিএনপির পাশে ছিলাম। এখন নির্বাচনে আমাদেরও শক্তিশালী অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য অন্তত ৫০ আসন দাবি করেছি। তবে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে আলোচনায় কিছুটা ছাড় দেয়ার সুযোগও থাকবে।” অন্যদিকে ১২ দলীয় জোটের এক নেতা মন্তব্য করেন, “আসনের সংখ্যা আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে মাঠ পর্যায়ে প্রার্থীকে জয়ী করার পরিবেশ তৈরি করা। বিএনপি যদি সৎভাবে সমঝোতা করে, তবে জোট শক্ত অবস্থানে থাকতে পারবে।”

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা এটাও মনে করছেন, এবারকার নির্বাচন বিএনপি ও তাদের শরিকদের জন্য একটি বড় পরীক্ষা। কারণ বিগত নির্বাচনগুলোতে দলটি অংশ নিলেও নানা কারণে প্রত্যাশিত সাফল্য আসেনি। এবার শরিকদের একসঙ্গে নিয়ে একটি বড় জোট গঠনের মাধ্যমে নির্বাচনী মাঠে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে চাইছে বিএনপি। এর জন্য দরকার কার্যকরী সমঝোতা এবং প্রতিটি আসনে সঠিক প্রার্থী নির্বাচন।

এদিকে সমমনা দলগুলোর কিছু প্রার্থী ইতিমধ্যেই মাঠে প্রচারণা শুরু করেছেন। এতে দেখা যাচ্ছে, কিছু আসনে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে শরিকদের মধ্যে সূক্ষ্ম বিরোধ তৈরি হচ্ছে। অনেক জায়গায় বিএনপির প্রার্থীরা মনে করছেন শরিকদের কারণে তাদের নিজস্ব অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে শরিক দলগুলোর অভিযোগ, বিএনপি এখনো স্পষ্ট করে জানাচ্ছে না তারা কোন আসন ছাড়তে রাজি।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে যে, লন্ডনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে একাধিক শরিক দলের নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা। এসব বৈঠকের মাধ্যমে আসন বণ্টন বিষয়ে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। তবে চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকেই।

নির্বাচনী বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন ভাগাভাগি নিয়ে জটিলতা কেবল বিএনপি জোটেই নয়, প্রায় সব রাজনৈতিক জোটের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। শাসক দল আওয়ামী লীগও শরিকদের সঙ্গে আসন বণ্টনে একই সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। তবে বিরোধী শিবিরের জন্য এটি বেশি জটিল, কারণ তারা আন্দোলন-সংগ্রামে একসঙ্গে থাকলেও নির্বাচনে কে কতটুকু গুরুত্ব পাবে তা এখনো অনিশ্চিত।

রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট ও খুলনা অঞ্চলের কয়েকটি আসন নিয়ে ইতিমধ্যেই আলোচনায় বেশ টানাপোড়েন চলছে। এসব এলাকায় শরিক দলগুলো জোর দাবি তুলেছে, অন্যদিকে বিএনপির স্থানীয় নেতারা নিজেদের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে চাইছেন। ফলে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে কঠিন সমীকরণের মুখে পড়তে হচ্ছে।

রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে, আসন বণ্টন নিয়ে যদি বিএনপি ও শরিকদের মধ্যে কোনো সমঝোতা না হয়, তবে নির্বাচনের আগে থেকেই বিরোধ ও অসন্তোষ সৃষ্টি হবে, যা নির্বাচনী ফলাফলে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিএনপির কৌশল নির্ধারণকারী মহল এখন সব ধরনের হিসাব-নিকাশ করে ভারসাম্য রক্ষা করার চেষ্টা করছে।

দেশের গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ভোটের আগ মুহূর্তে কে কটি আসন পাচ্ছে, কে প্রার্থী হচ্ছেন, এসব নিয়ে জনগণের আগ্রহ তুঙ্গে। একইসাথে সাধারণ ভোটাররাও জানতে চাইছেন, এই আসন বণ্টনের মাধ্যমে বিরোধী জোট আসলে কতটা শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়াতে পারবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, নির্বাচনী দৌড় শুরু হওয়ার আগেই বিরোধী শিবিরে আসন বণ্টন একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিএনপি যদি শরিকদের প্রত্যাশা পূরণ করে নির্বাচনে অংশ নিতে পারে, তবে তারা একটি শক্তিশালী জোট হিসেবেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। কিন্তু আসন বণ্টন নিয়ে যদি অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়, তবে বিরোধী জোটের ভেতরেই ভাঙন দেখা দেওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তাই আগামী কয়েক সপ্তাহ হবে বিএনপির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়, যেখানে তাদের কৌশল, সমঝোতা এবং সাংগঠনিক দৃঢ়তা ভবিষ্যৎ নির্বাচনী রাজনীতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত