শেখ হাসিনাসহ তিনজনের মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলায় যুক্তিতর্ক আজ শুরু

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৫৩ বার
ভারতের দ্বিধা, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজন আসামির বিরুদ্ধে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শুরু হচ্ছে আজ রোববার। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্য ও জেরা শেষে বিচারিক প্রক্রিয়া এখন প্রবেশ করছে চূড়ান্ত ধাপে। দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক মহল, মানবাধিকার সংগঠন এবং সাধারণ মানুষ নজর রাখছেন এই ঐতিহাসিক বিচারের দিকে, যা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছে।

এই মামলার ৫৪তম ও শেষ সাক্ষী ছিলেন মূল তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আলমগীর। গত বুধবার তার জেরা শেষে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১ আজকের দিনটি যুক্তিতর্কের জন্য নির্ধারণ করেন। তদন্ত কর্মকর্তাকে জেরা করেন শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন। আর রাজসাক্ষী হিসেবে আত্মসমর্পণ করা সাবেক পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী যায়েদ বিন আমজাদ।

ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজুমদার বুধবার শুনানির শেষ মুহূর্তে বলেন, “এটি একটি ঐতিহাসিক মামলা। আদালত সমস্ত সাক্ষ্য, জেরা ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে যথাযথ ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবে।” এরপর আদালত আজকের দিনটি যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের জন্য স্থির করে দেন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত সহিংসতা, হত্যাকাণ্ড ও নিপীড়নের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে এই মামলার সূচনা। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই মাসে গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন এলাকায় রাষ্ট্রবিরোধী সহিংসতা, হত্যা ও নির্যাতনের মাধ্যমে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়। এসব অপরাধে পরিকল্পনা, প্ররোচনা ও দায়িত্বহীনতার অভিযোগে শেখ হাসিনা, আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে আসামি করা হয়।

মামলার তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যায়টি ছিল দীর্ঘ ও জটিল। ২৫ কার্যদিবসে ৫৪ জন সাক্ষী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত রংপুরের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাবা, যিনি কণ্ঠ ভারী করে বলেন, “আমার ছেলেকে কেউ ফেরাতে পারবে না, তবে যারা এই হত্যার পরিকল্পনা করেছে, তারা যেন আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়—এইটাই আমার দাবি।”

এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক সাবেক উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামও সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি আদালতে বলেন, “জুলাই আন্দোলন কোনো সহিংসতা চায়নি। কিন্তু যেভাবে নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ।” তার বক্তব্য আদালতকক্ষে উপস্থিত অনেকের চোখে জল এনে দেয়।

অন্যদিকে, বিতর্কিত ‘আমার দেশ’ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে বলেন, “ঘটনাগুলোর নেপথ্যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল। রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের দায়িত্বেই সেই অপরাধের দায় বর্তায়।”

আসামিপক্ষের আইনজীবীরা অবশ্য ভিন্ন যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী আমির হোসেন বলেন, “এই মামলায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অনিশ্চিত পরিস্থিতিকে ব্যবহার করে অভিযোগ আনা হয়েছে। শেখ হাসিনা সরাসরি কোনো হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেননি, কিংবা কোনো অপারেশন পরিকল্পনায় সম্পৃক্ত ছিলেন না।” তিনি দাবি করেন, সাক্ষীদের অনেকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না, বরং শোনা কথার ভিত্তিতে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মামলাটি বাংলাদেশের বিচার ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। কারণ, এখানে অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারের উচ্চ পর্যায়ের আরও দুই কর্মকর্তা। একই সঙ্গে মামলাটিতে ‘রাষ্ট্রের দায়িত্বে অবহেলা’ এবং ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে প্ররোচনা’—দুটি ভিন্ন আইনি উপাদান যুক্ত হয়েছে, যা আগে কখনো একসঙ্গে বিচার হয়নি।

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই মামলাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোও ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক ব্যতিক্রমী বিচার প্রক্রিয়া হিসেবে তুলে ধরছে। লন্ডনের দ্য গার্ডিয়ান এক প্রতিবেদনে বলেছে, “এই মামলা শুধু রাজনৈতিক পরিণতি নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার বিচার ব্যবস্থায় জবাবদিহির নতুন মাত্রা যুক্ত করতে পারে।”

মামলার রাষ্ট্রপক্ষ জানিয়েছে, তারা ৫৪ জন সাক্ষীর বক্তব্য, ফরেনসিক প্রমাণ, ভিডিও ফুটেজ ও ডিজিটাল ডেটা বিশ্লেষণ করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে। প্রসিকিউশন টিমের প্রধান আইনজীবী আবুল হাসান আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা প্রমাণ করতে চাই যে এটি ছিল পরিকল্পিত অপরাধ। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে নিরীহ নাগরিকদের ওপর যে সহিংসতা চালানো হয়েছে, তার দায় এড়ানো সম্ভব নয়।”

অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এই মামলা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। শেখ হাসিনার নিকটজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ‘বিচার ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখেন’ এবং নিজেকে ‘রাজনৈতিক প্রতিশোধের শিকার’ মনে করেন।

রাষ্ট্রীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, যুক্তিতর্ক শেষ হলে আদালত মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখবে। সব প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণার মধ্য দিয়েই এই মামলার পরিসমাপ্তি ঘটবে। সাধারণত যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর ৩০ দিনের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়, তবে আদালত চাইলে সময় বাড়াতে পারে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই রায় শুধু তিনজন আসামির ভাগ্য নয়, বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, এই মামলার রায় দেশের ক্ষমতা কাঠামো, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।

আদালতের সামনে আজ সকাল থেকেই সাংবাদিক, আইনজীবী, ছাত্র-জনতা এবং সাধারণ দর্শনার্থীদের ভিড় দেখা গেছে। নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে আদালত প্রাঙ্গণে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধি উপস্থিত রয়েছেন এই যুক্তিতর্ক শুনানি কাভার করতে।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আলমগীর গত শুনানিতে বলেন, “প্রমাণপত্র, সাক্ষ্য ও ডকুমেন্ট বিশ্লেষণ করে আমরা নিশ্চিত হয়েছি যে জুলাই মাসে সংঘটিত ঘটনাগুলো ছিল পূর্বপরিকল্পিত। আমরা আদালতের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখি।”

আজকের এই যুক্তিতর্ক পর্বের মধ্য দিয়ে ২৫ কার্যদিবসের সাক্ষ্যগ্রহণ, ২৮ কার্যদিবসের জেরা ও প্রায় দুই মাসের বিচার প্রক্রিয়া নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে। আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম শেষ হলেই শুরু হবে অপেক্ষার প্রহর—যে রায় শুধু তিনজন ব্যক্তির নয়, বরং বাংলাদেশের বিচারিক ইতিহাসে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত