“তথ্য গায়েব, শহীদের নাম অজানা: জুলাই বিপ্লবের অন্ধকার অধ্যায়”

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৪১ বার
“তথ্য গায়েব, শহীদের নাম অজানা: জুলাই বিপ্লবের অন্ধকার অধ্যায়”

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা, বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন

ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ (সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল) ‘জুলাই বিপ্লব’ বলেই পরিচিত ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ১০ আগস্টের মধ্যে নিহত ও আহতদের তথ্য সঠিকভাবে রেকর্ড হয়নি—এমন অভিযোগ উঠেছে। হাসপাতালের অভ্যন্তরীন চিকিৎসক ও নার্সরা যেন এক ভাষায় বলছেন: “হাসপাতাল কর্তৃক দেওয়া সংখ্যা প্রকৃততা থেকে অনেক কম।”

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাদের দেওয়া তথ্য অনুসারে, ওই সময়ের মধ্যে সেখানে প্রায় তিন শতাধিক আহত এবং ৪৭ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়েছিল। কিন্তু জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসক ও নার্সদের কথায় মৃত্যুর সংখ্যা এই সংখ্যার দুই থেকে তিনগুণ বেশি। তারা দৃষ্টান্তস্বরূপ বলছেন, ১৮ জুলাই থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে শুধুই এক ওয়র্ডে ১৮০-২০০ জন চিকিৎসাধীন ছিল, দৈনিক ২-৩ জনের মৃত্যু হচ্ছিল। তথ্যরেকর্ডের নিয়মিত বইয়ের পৃষ্ঠাগুলি ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং নতুন নিবন্ধন বইও ‘গায়েব’ হয়েছে—এই অভিযোগ করছেন তারা।

চিকিৎসক ও নার্সদের ভাষায়, ওই সময় রাজধানী ও আশপাশের জেলার গুলিবিদ্ধ, কুপিকর আহত এবং মৃতদের মিছিল ছিল। ১৮ জুলাই একদিনেই শতাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে আনা হয়—তাঁদের মধ্যে মৃত ও আহত দুই ধরনেরই। ১৯ জুলাই একমাত্র দিনে অন্তত ৩৩ জন মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আসেন এবং আহতদের মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। ক্যাজুয়ালটি, ওয়ান স্টপ ইমার্জেন্সি বিভাগ এবং ইনডোর বিভাগ মিলিয়ে প্রায় ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে একদিনে। ২০ জুলাই একশিফটে একাধিক মরদেহ আনা হয়। ৫ আগস্টের আগ পর্যন্ত প্রতিদিন ১২ থেকে ১৫ জনের লাশ হাসপাতালে হস্তান্তর হয়েছে, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তা এক-ভাগে রেকর্ড করেছে।

হাসপাতালে আহতদের রেজিস্ট্রেশন বই ও নিবন্ধন পদ্ধতির কথা স্মরণ করে এক ট্রেইনি চিকিৎসক বলেন, “রোগীর নাম, পরিচয়, তারিখ ও চিকিৎসার তথ্য সহ রেজিস্ট্রার রাখা হয়। এখনও কার্বন কপি আমার কাছে আছে। কিন্তু রেকর্ডের মূল বইয়ে এ তথ্য নেই—সেটি স্যাররা নিয়ে গিয়েছেন আর আজ-কাল খোঁজ মিলছে না।” তিনি বলেন, আহত ও মৃতের দলে অনেকেই হাসপাতালে নিজেদের পরিচয় না দিয়ে যেতে রাজি হয়েছেন—ঝামেলা এড়াতে। তবে ভর্তি রোগীদের তথ্য রেকর্ডভুক্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছেন। অন্য এক চিকিৎসক জানান, ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৮ জুলাই থেকে ৬ আগস্টের মধ্যে ১৮০-২০০ জন ভর্তি ছিল, যার মধ্যে দৈনিক ২-৩ জন মারা যাচ্ছিল—তা রেকর্ড হয়নি।

জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীসহ অনেক আলেম-ওলামাকে মিথ্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে নিয়মিত সংবাদমাধ্যম বলেছে ১৪ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে নুরজাহান বেগম, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ উপদেষ্টা হিসেবে বলেন, প্রায় ৮৬৪ জন নিহত ও ১৪ হাজারের বেশি আহত হয়েছেন পুরো দেশের ‘জুলাই-আগস্ট বিপ্লব’-এ। এক সময়ে রাজধানী ঢাকার ১৪টি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ১৬ জুলাই থেকে ২২ জুলাইয়ের মধ্যে ১৬৮ জনের মৃত্যু রেকর্ড করা হয়।

হাসপাতাল পরিচালক ডা. শফিউর রহমান (সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক) অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় মনোনীত কমিটি তথ্য যাচাই-বাছাই করেছে এবং সমস্ত ডকুমেন্টস সংরক্ষিত আছে। তিনি বলেন, “সরকারি তথ্য গোপন করে আমার ভয় নেই—অফিশিয়ালি নতুন পরিচালককে বুঝিয়ে দিয়েছি।”

চিকিৎসক ও নার্সদের দাবি যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় তথ্য, রেজিস্ট্রেশন বইয়ের মূল পৃষ্ঠা, অথচ হাসপাতাল কর্তৃক প্রদত্ত তথ্য ও মন্ত্রণালয়ের তালিকা একে-একে খতিয়ে দেখতে হবে। তথ্যভিত্তিক এই দাবি থাকলেও, স্বাধীনভাবে এটি যাচাই করতে প্রতি-ব্লগ বা আদালতের অনুমোদিত তদারকি নেই বলেই সংশ্লিষ্ট একটি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সংবাদদাতাকে জানিয়েছেন।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রোগী ও হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করা চিকিৎসক-নার্সদের একাধিক সাক্ষ্য থেকে অভ্যন্তরীনভাবে ধ্বংস বা গায়েব করা রেকর্ডের দাবিই উঠে এসেছে—বিশেষ করে চিকিৎসাসেবা দেওয়া অবস্থায় সংগ্রহ করা নাম, পরিচয়, রক্তদান অথবা অস্ত্রোপচার তথ্য পিছনে রাখা হয়েছে বলে তারা বলছেন। এই ধরনের তথ্য গোপন করার উদ্দেশ্য হওয়া থাকতে পারে হেতু: ঘটনার অনিয়ম গোপন করা, কোনো রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে ক্ষতিপূরণ অথবা “শহীদ” ও “আহত” তালিকায় অন্তর্ভুক্তি প্রতিরোধ করা।

এই প্রসঙ্গে জুলাই শহীদ স্মৃতি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী লে. কর্নেল (অব.) কামাল আকবর বলেছেন, “শুধুই সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নয়—দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে তথ্য-প্রমাণ ধ্বংস হয়েছে। যারা তখন প্রশাসনে ছিলেন, তাদের দায় আছে। এটি তারা বাধ্য হয়ে করেছে নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে—এই দৃষ্টিভঙ্গা আমরা খতিয়ে দেখতে চাই।”

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. সাইদুর রহমান জানিয়েছেন, “এটি যদি ঘটে থাকে তাহলে এটি অপরাধ। তবে এ বিষয়ে এখনো আবেদন আমাদের কাছে আসেনি। যদি কেউ বা হাসপাতাল অভিযোগ করে, তাহলে আমরা বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখব।”

বিশ্লেষকরা বলছেন, ইতিহাস ও মানবাধিকার-প্রেক্ষাপটে তথ্যরেকর্ড গোপন করা একটি বড় সংকেত—কারণ নির্ধারিত সময়ের ঘটনার প্রকৃত পরিধি জানা না থাকলে আইনগত, সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে সঠিকভাবে দায় নির্ধারণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম চালানো সম্ভব হয় না। রেকর্ডের ধ্বংস বা গায়েব হওয়ার বিষয়টি শুধু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়িয়ে যায়—এটি হতে পারে ঘটনার পরবর্তী অনুসন্ধান বা বিচারপ্রক্রিয়া প্রতিরোধ করার একটি অংশ।

যদিও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তথ্য রেকর্ড ধ্বংস বা গায়েব করার অভিযোজন অস্বীকার করছে, অথচ চিকিৎসক-নার্সদের অভ্যন্তরীয় বর্ণনায় ঘাটতি ও লোপের কথা স্পষ্ট। তথ্যরক্ষার ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট হিসাব, সময়মত আপডেট এবং স্বচ্ছতা রাখতে শাসনপ্রণালীতে বড় শূন্যতা রয়েছে—যা শুধু এক-হসপিটালের ঘটনা নয়, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থারও পরিচয়।

পরবর্তী পর্যায়ে প্রাসঙ্গিক কর্তৃপক্ষদের এনে দেওয়া হবে তদন্তের জন্য কোড়া, রেকর্ডস ও সাক্ষ্য। সঠিকভাবে হিসাব নিলে সপ্তাহ-দিনের জন্য নয়, মাস বা বছরের পরিমাপে “হতাহত” ও “নিহত” তালিকা তৈরি সম্ভব হবে। রেকর্ড গায়েবের অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু এসব পরিস্থিতিতে ভুল তথ্য-উপাত্ত বা লোপাট করা রেকর্ড আর শুধু প্রশাসনিক ভুল নয়—এটি মানবাধিকারের বড় চ্যালেঞ্জও বটে।

এই সংবাদ অনুসন্ধানে অংশগ্রহণ করেছেন হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক-নার্স ও ট্রেইনিরা, তালিকা প্রস্তুতকারক কর্মকর্তা, তথ্য ও আর্টিকেলে উপস্থাপন। আগামী দিনে অনলাইন পাঠক ও সংশ্লিষ্টরা যদি চান, তাহলে আমরা হাসপাতালে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রেশন বইয়ের কার্যনির্বাহী দল, বিচারপ্রক্রিয়া বা স্বাধীন তদন্ত কমিটির তথ্য অনুসন্ধান করব।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত