হিন্দু সম্মেলনে জামায়াত নেতার আহ্বান: “ধর্ম নয়, উন্নয়নেই আসুক ঐক্য”-গোলাম পরওয়ার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৫
  • ৭৬ বার
হিন্দু সম্মেলনে জামায়াত নেতার আহ্বান: “ধর্ম নয়, উন্নয়নেই আসুক ঐক্য”-গোলাম পরওয়ার

প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, “ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, হিন্দুরাও এখন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে এক হয়েছে।” শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) সকালে খুলনার ডুমুরিয়ার স্বাধীনতা চত্বরে আয়োজিত “হিন্দু সম্মেলন”-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।

জামায়াতের ডুমুরিয়া উপজেলা সনাতন শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এ সম্মেলনে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজারো মানুষ উপস্থিত ছিলেন। সকাল থেকেই উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ঢোল, তবলা, কাসা ও নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দলবদ্ধভাবে অংশ নিতে আসেন তারা। সম্মেলন প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ; নারী-পুরুষের উপস্থিতিতে স্বাধীনতা চত্বরে উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। নাচ, গান ও ধর্মীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়।

অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যারা দেশ পরিচালনা করেছে, তারা কেউই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রকৃত উন্নয়নে আন্তরিক ছিল না। তাঁর দাবি, অতীতে রাজনৈতিক দলগুলো হিন্দু সম্প্রদায়কে ব্যবহার করেছে কেবল রাজনৈতিক ফায়দা লোটার জন্য, কিন্তু তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেয়নি কেউ। তিনি বলেন, “স্বাধীনতার পর যারাই দেশ চালিয়েছে, তারা হিন্দুদের ব্যবহার করে নিজেদের ভাগ্যোন্নয়ন করেছে। এখন সময় এসেছে এমন একটি ইসলামী সরকারের, যা হিন্দু-মুসলমান নির্বিশেষে সবার অধিকার ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।”

তিনি আরও বলেন, দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। “আমরা লাঙলের শাসন দেখেছি, ধানের শীষের শাসন দেখেছি, নৌকার শাসনও দেখেছি। এখন একটাই দল বাকি আছে — সেটি হলো জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা।”

অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার তাঁর বক্তব্যে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, “দেড় হাজার শহীদের আত্মত্যাগ, চল্লিশ হাজার আহতের সংগ্রাম, আর চব্বিশ সালের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে — তারা পরিবর্তন চায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের সব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে সেই বার্তা এসেছে। আগামী জাতীয় নির্বাচনে জনগণও সেই পরিবর্তনের ধারায় নিজেদের মতামত দেবে, ইনশাআল্লাহ।”

জামায়াত নেতা আরও বলেন, “এখন জনগণের সামনে দুটি পথ — একটি হচ্ছে পুরনো রাজনীতির পুনরাবৃত্তি, আরেকটি হচ্ছে ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথ। আমি বিশ্বাস করি, মানুষ সেই পরিবর্তনের দিকেই হাঁটছে।”

তিনি “জুলাই সনদ” ও “নভেম্বর গণভোট” প্রসঙ্গে বলেন, “আগামী নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট দিতে হবে, এবং নির্বাচনের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। এই দুটি পদক্ষেপের মাধ্যমেই ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন দিতে হবে। তবেই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ সম্ভব।”

অধ্যাপক গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা চাই, এই দেশ হোক সবার। মুসলমান যেমন নিরাপদ থাকবে, তেমনি হিন্দুরাও থাকবে সমান মর্যাদায়। আমরা হিন্দু ভাইদের ভয় দেখাতে চাই না; বরং তাদের সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়ন করতে চাই। ভয় দেখিয়ে লাভ নেই, এখন হিন্দুরাও জানে কোন শক্তি তাদের প্রকৃত অধিকার দেবে।”

ডুমুরিয়ার স্থানীয় উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ডুমুরিয়া একসময় সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্য ছিল। আমি যখন সংসদ সদস্য ছিলাম, তখন এলাকা সন্ত্রাসমুক্ত করেছি। জনগণ যদি আবার সুযোগ দেয়, ডুমুরিয়াকে আমি একটি মডেল উপজেলা হিসেবে গড়ে তুলব — যেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও শিল্প—সব ক্ষেত্রে সমন্বিত উন্নয়ন হবে।”

সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন উপজেলা হিন্দু কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যক্ষ দেব প্রসাদ মণ্ডল। উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় হিন্দু সংগঠনের নেতারা — প্রমত গাইন, ডা. হরিদাস মণ্ডল, অধ্যক্ষ সুভাষ সরদার, অ্যাডভোকেট আপোষ সিংহ ও কানাই লাল কর্মকার। বক্তারা বলেন, ধর্মীয় সম্প্রীতি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি, আর সেটিকে ধরে রাখতে সব সম্প্রদায়ের একসঙ্গে কাজ করা জরুরি।

সম্মেলনের আয়োজকরা জানান, এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের সামাজিক, ধর্মীয় ও নাগরিক অধিকার নিয়ে আলোচনা করা এবং স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রমে তাদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। তারা বলেন, অতীতে রাজনীতির কারণে হিন্দু সম্প্রদায় অনেক সময় প্রান্তিক হয়ে পড়েছে, কিন্তু এখন সময় এসেছে সেই বিভাজন কাটিয়ে উঠে ঐক্যের পথে হাঁটার।

সকাল থেকেই ডুমুরিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ ঢাক-ঢোল বাজিয়ে, রঙিন পতাকা ও ব্যানার হাতে সম্মেলনস্থলে পৌঁছান। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনুষ্ঠান প্রাঙ্গণ পরিণত হয় উৎসবে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা। সম্মেলন শেষে স্বাধীনতা চত্বর থেকে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। এতে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষ অংশ নেন। র‍্যালিটি ডুমুরিয়া বাজার, কলেজ মোড়সহ প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে এসে শেষ হয়।

জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা দাবি করেন, এই আয়োজনের মাধ্যমে দলটি সামাজিক সম্প্রীতির বার্তা দিতে চায়। তারা বলেন, জামায়াত শুধু একটি রাজনৈতিক দল নয়, বরং এটি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তাদের মতে, এই সম্মেলন সেই প্রয়াসেরই একটি উদাহরণ।

অন্যদিকে, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে একটি কৌশলগত বার্তা বহন করছে। একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “দাঁড়িপাল্লার পক্ষে হিন্দুরাও এক হয়েছে — এই বক্তব্যের মাধ্যমে জামায়াত চেষ্টা করছে নিজেদের রাজনৈতিক পরিসরকে প্রসারিত করার, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে।”

তবে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও রাজনৈতিক বার্তা একই মঞ্চে মিশে যাওয়ায় কেউ কেউ উদ্বেগও প্রকাশ করেছেন। এক স্থানীয় নাগরিক বলেন, “যে কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠানে রাজনীতি প্রবেশ করলে সেটি সংবেদনশীল হতে পারে। তবে যদি উদ্দেশ্য হয় সামাজিক ঐক্য, তাহলে সেটি ইতিবাচক।”

দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানে উৎসবের আমেজ ছিল স্পষ্ট। বেলা শেষে র‍্যালি শেষ হলে স্থানীয় শিল্পীরা ধর্মীয় সংগীত পরিবেশন করেন, পরে মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়।

গোলাম পরওয়ার তাঁর সমাপনী বক্তব্যে বলেন, “আমরা এমন বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবাই সমান অধিকার ও মর্যাদা ভোগ করবে। ইসলাম শান্তির ধর্ম, আর শান্তির সমাজ গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com