তাইওয়ান প্রসঙ্গে জাপানকে চীনের কঠোর হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
তাইওয়ান প্রসঙ্গে জাপানকে চীনের কঠোর হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

চীন ও জাপানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা নতুন করে ঘনীভূত হয়েছে তাইওয়ান প্রণালীকে কেন্দ্র করে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচির সাম্প্রতিক মন্তব্যের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বেইজিং স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে, তাইওয়ান প্রণালীতে টোকিওর যে কোনো ধরনের সামরিক সম্পৃক্ততা চীনের দৃষ্টিতে সরাসরি ‘আগ্রাসন’ হিসেবে বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে তারা হুঁশিয়ারি দিয়েছে, এমন উদ্যোগ নেওয়া হলে পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) “শক্তিশালী পাল্টা আক্রমণ” চালাতে বাধ্য হবে।

বৃহস্পতিবার (১৩ নভেম্বর) চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র সিনিয়র কর্নেল লিন জিয়ান জাপানকে এমন কড়া ভাষায় সতর্ক করেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে এক ধরনের ক্ষোভ, আস্থাহীনতা এবং অতীত ইতিহাসের বেদনাদায়ক স্মৃতি, যা দুই দেশের সম্পর্ককে বারবার উত্তপ্ত করে তোলে।

লিন জিয়ান বলেন, “যদি জাপান তাইওয়ান প্রণালীতে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে হস্তক্ষেপের সাহস দেখায়, সেটা নিশ্চিতভাবেই আগ্রাসনের পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হবে। চীনের পক্ষ থেকে শক্তিমত্তার সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা আক্রমণ করা ছাড়া কোনো পথ খোলা থাকবে না।” তাঁর কণ্ঠে ছিল কঠোর সংকল্প—যেনো যে কোনো ধরনের সেনা উপস্থিতিকে চীন তার সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত মনে করে।

তিনি আরও বলেন, “জাপান যদি ইতিহাসের শিক্ষা ভুলে তাইওয়ান ইস্যুতে হস্তক্ষেপের ঝুঁকি নেয়, তবে তাদের পিএলএর কাছে লজ্জাজনক পরাজয়ের মুখোমুখি হতে হবে। সেই সঙ্গে দিতে হবে ভয়াবহ মূল্য।” চীন বহুবারই জাপানকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস স্মরণ করিয়ে সতর্ক করে এসেছে, আর এবারও সেই একই ইতিহাসের প্রসঙ্গ টেনে কঠোর কূটনৈতিক বার্তা দেওয়া হলো।

লিন জিয়ান তাঁর বক্তব্যে তাইওয়ান প্রসঙ্গকে “সম্পূর্ণরূপে চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়” হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, তাইওয়ান ইস্যুতে বিদেশি কোনো দেশের হস্তক্ষেপ চীন কখনোই সহ্য করবে না। বেইজিংয়ের মতে, তাইওয়ানের ওপর তাদের সার্বভৌমত্ব অবিচ্ছেদ্য এবং সেই দাবি প্রশ্নাতীত।

এই পুরো উত্তেজনার সূত্রপাত গত সপ্তাহে জাপানি পার্লামেন্টের এক বিতর্কে। সেখানে প্রধানমন্ত্রী সানে তাকাইচি বলেন, তাইওয়ানের কাছে সামরিক উত্তেজনা বা সংঘাত সৃষ্টি হলে তা জাপানের জন্য “অস্তিত্বগত হুমকি” তৈরি করবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে গেলে জাপান তার “সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকার” প্রয়োগে বাধ্য হতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। জাপানের নিরাপত্তানীতি অনুযায়ী, দেশটিতে সরাসরি আক্রমণ না হলেও যদি মিত্র দেশের ওপর হামলার কারণে জাপানের অস্তিত্ব ঝুঁকিতে পড়ে, তবে তারা সম্মিলিত আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে পারে।

তাকাইচির এই বক্তব্য বেইজিংকে তীব্র ক্ষুব্ধ করে। চীনের নেতারা মনে করেন, তাইওয়ান প্রণালীতে জাপানের এমন সরব ও দৃঢ় অবস্থান কেবল অঞ্চলের উত্তেজনা বাড়াবে। এর পরপরই ওসাকায় নিযুক্ত চীনের কনসাল জেনারেল জুয়ে জিয়ান অন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ একটি পোস্ট দেন, যেখানে তিনি জাপানি প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে “মাথা কেটে ফেলা হবে”—এমন চরম মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য পোস্টটি মুছে ফেলা হয়। তবে ক্ষোভের ভাষা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তোলে। টোকিও এ ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং চীনা কূটনৈতিক আচরণকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করে।

তাইওয়ান প্রণালীকে ঘিরে প্রতিযোগিতা শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি কৌশলগত এবং সামরিক হিসেবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রপথ—যেখানে প্রতিদিন শত শত বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, চীন—তিনটি দেশই এ অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থানকে অধিকতর শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। ফলে সামান্য মন্তব্যও এখানে হয়ে ওঠে বড় কূটনৈতিক অস্থিরতার কারণ।

১৯৪৯ সালের পর থেকে তাইওয়ান নিজস্ব প্রশাসন ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বেইজিং তাইওয়ানকে চীনের একটি প্রদেশ হিসেবে বিবেচনা করে এবং একীকরণকে “ঐতিহাসিক দায়িত্ব” মনে করে। রাশিয়া ও আরও কয়েকটি দেশ বেইজিংয়ের এই অবস্থানকে সমর্থন করে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান ‘তাইওয়ানের নিরাপত্তা’ নিয়ে বহুবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাপানের অবস্থান আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাদের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় দ্বীপপুঞ্জ তাইওয়ানের খুব কাছেই অবস্থিত।

সাম্প্রতিক সময়ে জাপান তার প্রতিরক্ষা বাজেট বড় ধরনের বৃদ্ধি করেছে। চীন ও উত্তর কোরিয়ার সামরিক তৎপরতাকে কারণ হিসেবে দেখিয়ে টোকিও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, দীর্ঘ-পাল্লার হামলা সক্ষমতা এবং সামুদ্রিক শক্তি বৃদ্ধি করছে। এমন প্রেক্ষাপটে চীনের এমন হুমকি দুই দেশের সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

জাপানের অভ্যন্তরেও বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। অনেক রাজনীতিক মনে করেন, এশিয়ায় চীনের উত্থান এবং আগ্রাসী আচরণের বিরুদ্ধে জাপানের আরও শক্ত প্রতিরক্ষা ভঙ্গি গ্রহণ করা জরুরি। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, অতিরিক্ত সামরিকীকরণ কেবল প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে উত্তেজনা বাড়াবে এবং এতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

চীন অবশ্য বারবার বলছে, তাদের সামরিক অবস্থান আগ্রাসী নয় বরং প্রতিরক্ষামূলক; তবে তাইওয়ান প্রসঙ্গে তারা কখনোই আপস করবে না। দেশটির নেতৃত্বের ভাষায়, “তাইওয়ান চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়, এবং জাতীয় ঐক্যই আমাদের শেষ লক্ষ্য।”

এদিকে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, চীন-জাপান উত্তেজনা শুধু দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে নয়; পুরো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোকেও প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, এবং ইউরোপীয় দেশগুলো নিবিড়ভাবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য তাইওয়ান প্রণালী “ইন্দো-প্যাসিফিক নিরাপত্তার কেন্দ্রবিন্দু।”

তাইওয়ান প্রণালীর ভবিষ্যৎ কী—এ প্রশ্নের উত্তর অদূর ভবিষ্যতে সুস্পষ্ট নয়। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক উত্তেজনা বাড়লে এর প্রভাব শুধু দুই দেশের নয়, পুরো বিশ্বের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর পড়বে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, বৈশ্বিক বাণিজ্যপথ এবং আঞ্চলিক সামরিক ভারসাম্য গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এমন সংবেদনশীল পরিস্থিতিতে চীনের এমন হুঁশিয়ারি আরও বড় ধরনের কূটনৈতিক অস্থিরতার ইঙ্গিত দেয়। একই সঙ্গে জাপানের ক্রমশ দৃঢ়তর নিরাপত্তানীতি এ অঞ্চলকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। ভবিষ্যতে দুই দেশ কোন পথে এগোবে, তা এখন ভূরাজনীতির প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com