ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা হৃদরোগ ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭১ বার
ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা হৃদরোগ ঝুঁকি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফ্লু বা ইনফ্লুয়েঞ্জা—শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে সাধারণ সর্দি–জ্বরের একটি পরিচিত অসুস্থতার কথা আসে। বছরে অন্তত একবার এই ফ্লু-সংক্রান্ত সমস্যায় বহু মানুষই আক্রান্ত হন, বিশেষ করে ঋতু পরিবর্তনের সময়। হঠাৎ জ্বর, গলা ব্যথা, কাশি, শরীর ব্যথা আর ক্লান্তি—এই সবকিছুই আমাদের কাছে পরিচিত এবং সাধারণ বলে মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞান বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে, বিষয়টি কখনোই হালকা নয়। বহু গবেষণা বলছে, ইনফ্লুয়েঞ্জা কেবল একটি ভাইরাসজনিত রোগ নয়, বরং এটি শরীরের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর গভীর ও মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ানো।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের গবেষকরা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইনফ্লুয়েঞ্জাকে হৃদরোগের সঙ্গে যুক্ত করে যেসব তথ্য তুলে ধরেছেন, তা সাধারণের চোখ খুলে দেওয়ার মতোই। বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার পরপরই হার্ট অ্যাটাক বা একিউট কার্ডিয়াক ইভেন্টের ঝুঁকি সাধারণ সময়ের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বৃদ্ধি পায়। এর কারণ ব্যাখ্যায় বলা হয়, ফ্লু ভাইরাস শরীরে প্রবেশের পর সারা শরীরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, রক্তনালীতে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে এবং পূর্বে থাকা ক্ষুদ্র সমস্যাগুলোকে তীব্র করে তোলে। ফলে যাদের মধ্যে আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোরোনারি হার্ট ডিজিজের মতো ঝুঁকি থাকে, তাদের জন্য ফ্লু দ্রুতই বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

এখানেই আসে ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকার গুরুত্ব। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন কেবল ভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতেই সাহায্য করে না, বরং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। গবেষণা তথ্য বলছে, ফ্লু ভ্যাকসিন গ্রহণ করলে হৃদরোগের ঝুঁকি ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসে। তুলনামূলক হিসাবে দেখা যায়, কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধে ঝুঁকি কমে প্রায় ৩০ শতাংশ, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধে কমে প্রায় ২৫ শতাংশ এবং ধূমপান বন্ধ করলে ঝুঁকি কমে প্রায় ৪৩ শতাংশ। সেক্ষেত্রে একাই ৪৫ শতাংশ ঝুঁকিহ্রাসের ক্ষমতা রাখে মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন, যা হৃদরোগ প্রতিরোধে একটি কার্যকর ও সহজ উপায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সাম্প্রতিক চিকিৎসা অগ্রগতির ফলে বর্তমানে বাজারে রয়েছে আরও উন্নতমানের ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ভ্যাকসিন হলো Influvax Tetra, যা একটি quadrivalent ভ্যাকসিন। অর্থাৎ এটি একসঙ্গে চার ধরনের ভাইরাসের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়। প্রতি ডোজ মাত্র শূন্য দশমিক পাঁচ মিলিলিটার, যা পেশিতে ইনজেকশনের মাধ্যমে প্রয়োগ করা হয়। ভ্যাকসিনটিতে রয়েছে মৌসুমি ফ্লুর সর্বশেষ চার ধরনের ভাইরাস স্ট্রেইন—H1N1, H3N2, B/Victoria এবং B/Yamagata। এ চারটি ভাইরাসই প্রতি বছর সারাবিশ্বে মৌসুমি ফ্লুর বড় অংশ ঘটায়, বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলে। তাই চার ধরনেরই সুরক্ষা পাওয়া মানে রোগ প্রতিরোধে আরও উন্নত নিশ্চয়তা।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইনফ্লুয়েঞ্জাকে সাধারণ অসুখ ধরে নেওয়া অনেক সময় গুরুতর ভুলের জন্ম দেয়। বিশেষ করে প্রবীণ ব্যক্তিরা, ডায়াবেটিস রোগী, উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদরোগে ভোগা মানুষ এবং যাদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম—এসব ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তির ক্ষেত্রে ফ্লু দ্রুত মারাত্মক রূপ নিতে পারে। দেখা গেছে, ফ্লু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ফুসফুসে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া কিংবা হঠাৎ হৃদরোগের জটিলতা বৃদ্ধির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা হাসপাতাল ভর্তি এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

স্বাস্থ্য গবেষকদের মতে, ফ্লুর কারণে শরীরে যে তীব্র প্রদাহ সৃষ্টি হয়, তা হৃদপিণ্ডের চারপাশের রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ বাড়ায়। এতে রক্তে জমাট বাঁধার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়। যার ফল হিসেবে হৃদরোগের সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়ে। সেই সঙ্গে ফ্লু আক্রান্ত হওয়ার সময় যে জ্বর বা শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, সেগুলোও আগের থাকা হৃদরোগজনিত সমস্যাকে জটিল করে তুলতে পারে। তাই ফ্লু যত সাধারণই হোক, এর প্রভাব যে অত্যন্ত গভীর হতে পারে তা চিকিৎসকরা বহু আগেই জানিয়ে আসছেন।

ইনফ্লুয়েঞ্জা ভ্যাকসিন ঠিক এখানেই কার্যকর অস্ত্র হিসেবে উঠে আসে। বিশ্বের অনেক দেশেই এখন মৌসুমি ফ্লু টিকা বছরে একবার নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়, বিশেষত যাদের মধ্যে ঝুঁকি বেশি। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সচেতনতা বাড়ছে। তবে এখনো সাধারণ মানুষের মধ্যে ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে সচেতনতা অনেক কম। চিকিৎসকদের মতে, যেসব রোগী নিয়মিত হৃদরোগের ওষুধ খায় বা যাদের ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ আছে, তাদের জন্য ফ্লু ভ্যাকসিন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, এসব রোগীদের হৃদরোগ বা স্ট্রোকের ঝুঁকি সাধারণ সময়েই বেশি থাকে, আর ফ্লু সংক্রমণে সেই ঝুঁকি দ্বিগুণ হয়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, আধুনিক চিকিৎসায় প্রতিরোধকে সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফ্লু ভ্যাকসিন সেই প্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যতম সহজ উপায়। একদিকে এটি মৌসুমি ফ্লু প্রতিরোধ করে, অন্যদিকে হৃদপিণ্ডকে নিরাপদ রাখে। এছাড়া যারা যেকোনো কারণে বারবার শ্বাসযন্ত্রের সংক্রমণে আক্রান্ত হন, তাদের জন্যও ফ্লু ভ্যাকসিন আশীর্বাদস্বরূপ। বহু হাসপাতালে দেখা গেছে, নিয়মিত ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়া রোগীরা মৌসুমি সংক্রমণের সময় কম অসুস্থ হন এবং হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার হারও কমে যায়।

ফ্লু ভ্যাকসিন নিয়ে মানুষের মনে কিছু ভুল ধারণাও রয়েছে। অনেকে মনে করেন ভ্যাকসিন নিলে ফ্লু হয়ে যায়। কিন্তু চিকিৎসা বিজ্ঞানে এটি সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত। ভ্যাকসিন শরীরে ভাইরাস নয়, বরং ভাইরাসের নিষ্ক্রিয় উপাদান বা অনুকরণ পাঠায়, যা শরীরকে অ্যান্টিবডি তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করে। ফলে প্রকৃত ভাইরাস আক্রমণ করলে শরীর প্রস্তুত থাকে এবং সহজেই প্রতিরোধ করতে পারে।

সাম্প্রতিক গবেষণা ও চিকিৎসকদের অভিমত স্পষ্ট—ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা শুধু রোগ প্রতিরোধেই নয়, বরং হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতেও অত্যন্ত কার্যকর। বিশেষ করে যাদের বয়স বেশি, যাদের একাধিক দীর্ঘস্থায়ী রোগ রয়েছে বা যারা নিয়মিত হৃদযন্ত্রের সমস্যা নিয়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন, তাদের জন্য এ টিকা বছরের পর বছর সুরক্ষা তৈরি করে।

স্বাস্থ্যসচেতনতার এই সময়ে মৌসুমি ফ্লু ভ্যাকসিন নেওয়ার গুরুত্ব তাই আরও বাড়ছে। প্রতিবছর একটি ছোট ডোজ নিতে পারলেই শুধু ফ্লুর কষ্টই কমে না, বরং হৃদয়ের বড় ধরনের ঝুঁকিও এড়ানো যায়। চিকিৎসকদের ভাষায়, নিজের সম্পূর্ণ শরীর—বিশেষত হৃদয়কে—আরও নিরাপদ রাখতে নিয়মিত ইনফ্লুয়েঞ্জা টিকা নেওয়া এখন সময়ের দাবিই বলা যায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com