এডেন বিমানবন্দরে ফ্লাইট বন্ধ, যাত্রীদের অনিশ্চয়তা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৯২ বার
এডেন বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ, যাত্রীদের ভোগান্তি

প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই এই বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ধরনের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিল (এসটিসি) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। ফ্লাইট বাতিল ও অনিশ্চয়তার খবরে বিমানবন্দরের টার্মিনালে ভিড় করছেন অসংখ্য যাত্রী। কেউ কেউ টিকিট বাতিল বা পুনঃনির্ধারণের তথ্য জানতে ব্যস্ত, আবার অনেকে দীর্ঘ অপেক্ষায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন।

এই আকস্মিক সিদ্ধান্ত এসেছে এমন এক সময়ে, যখন সৌদি আরব সমর্থিত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতপন্থী এসটিসির মধ্যে ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উত্তেজনা নতুন করে বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই দুই পক্ষের টানাপোড়েন ইয়েমেনের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে জটিল করে তুলেছে। তারই সর্বশেষ প্রভাব পড়ল দেশটির অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দরের ওপর, যা সাধারণ মানুষের যাতায়াত ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগে বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয় টেলিভিশন চ্যানেল এআইসি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সৌদি আরবের নির্দেশেই এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সব ফ্লাইট সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিমানবন্দরের কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত হয়ে পড়ে। সাধারণত এই বিমানবন্দর থেকে সৌদি আরব, মিশর ও জর্ডানের সঙ্গে নিয়মিত ফ্লাইট চলাচল করে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কর্মরত হাজার হাজার ইয়েমেনি নাগরিকের জন্য এই রুটগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রবাসী যাত্রীদের পাশাপাশি চিকিৎসা, শিক্ষা ও জরুরি কাজে বিদেশে যাতায়াতকারী মানুষেরাও চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন।

বিমানবন্দরের ভেতরের চিত্র আরও হতাশাজনক। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ফ্লাইটের তথ্য বোর্ডে একের পর এক বাতিলের নোটিশ ভেসে উঠছে। অনেক যাত্রী ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাচ্ছেন না। কেউ কেউ অভিযোগ করেছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পরিষ্কার নির্দেশনা না পাওয়ায় তারা কী করবেন বুঝে উঠতে পারছেন না। শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ যাত্রীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

এই পরিস্থিতিতে এসটিসি কর্তৃপক্ষের অধীনে পরিচালিত পরিবহন ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় সৌদি আরবের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির চুক্তির অংশ হিসেবে এডেন বিমানবন্দর পরিচালিত হচ্ছে। সেখানে হঠাৎ করে এমন সিদ্ধান্ত ইয়েমেনের সার্বভৌমত্ব ও বেসামরিক বিমান চলাচলের স্বাভাবিক কার্যক্রমের পরিপন্থী।

বিবৃতিতে আরও জানানো হয়, সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোটের পক্ষ থেকে তারা একটি স্মারক পেয়েছেন। ওই স্মারকে বলা হয়েছে, এডেন থেকে পরিচালিত সব আন্তর্জাতিক ফ্লাইটকে প্রথমে সৌদি আরবের জেদ্দা বিমানবন্দরে যাত্রাবিরতি করতে হবে। সেখানে যাত্রী ও বিমানের ওপর পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ফ্লাইটগুলো তাদের চূড়ান্ত গন্তব্যে যেতে পারবে। এই নির্দেশনার ফলে এডেন বিমানবন্দরের স্বাভাবিক ফ্লাইট সূচি পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে।

পরিবহন ও বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্তে তারা মর্মাহত ও বিস্মিত। কারণ, এডেন বিমানবন্দর ইতোমধ্যেই নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত মান বজায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে বলে তাদের দাবি। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এ ধরনের আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা ইয়েমেনের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে আরও দুর্বল করে তুলবে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়াবে।

তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ পরবর্তীতে এক ব্যাখ্যায় জানিয়েছে, এই নিষেধাজ্ঞা মূলত এডেন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে পরিচালিত ফ্লাইটের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। অন্য আন্তর্জাতিক রুটের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে তারা উল্লেখ করেছে। কিন্তু বাস্তবে বিমানবন্দরে সব ফ্লাইট বন্ধ থাকায় যাত্রীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ও উদ্বেগ কাটেনি।

বিশ্লেষকদের মতে, এডেন বিমানবন্দরের ফ্লাইট বন্ধের পেছনে কেবল নিরাপত্তা নয়, বরং রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশও বড় ভূমিকা রাখছে। ইয়েমেনের দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত উভয়েই আলাদা আলাদা গোষ্ঠীকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ফলে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা ও প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে বেসামরিক অবকাঠামোও অনেক সময় চাপের মুখে পড়ছে।

এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগের একটি প্রধান কেন্দ্র। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই দেশে যখন সীমিত কয়েকটি বিমানবন্দর কার্যকর রয়েছে, তখন এডেনের মতো একটি বিমানবন্দর বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে দেশের সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগ আরও সংকুচিত হওয়া। বিশেষ করে মানবিক সহায়তা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যাতায়াতের ক্ষেত্রে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সাধারণ যাত্রীদের প্রতিক্রিয়াও এই উদ্বেগেরই প্রতিফলন। অনেক যাত্রী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে লিখেছেন, রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মাশুল কেন সাধারণ মানুষকে দিতে হবে। কেউ কেউ আবার দ্রুত সমাধানের আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, যুদ্ধ ও সংকটের মধ্যেই তারা বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, এখন অন্তত নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগটুকু হারাতে চান না।

সব মিলিয়ে, এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হওয়া ইয়েমেনের চলমান সংকটের আরেকটি প্রতিচ্ছবি। রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব ও নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ—সবকিছু মিলিয়ে দেশটির সাধারণ মানুষের জীবন আরও জটিল হয়ে উঠছে। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত না থাকায় যাত্রীদের অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠা দিন দিন বাড়ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com