চট্টগ্রামে ৮ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : রবিবার, ৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৭৬ বার
চট্টগ্রামে ৮ প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল, রাজনৈতিক অঙ্গনে তোলপাড়

প্রকাশ: ০৪ জানুয়ারি ২০২৬। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

চলমান জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে প্রার্থী যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের সিদ্ধান্ত এসেছে। জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থীসহ মোট আটজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। রোববার জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শুনানি শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তারা এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী যাচাই-বাছাই শেষে দেওয়া এই সিদ্ধান্ত চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও উত্তেজনা তৈরি করেছে।

রোববার সকাল ১০টা থেকে চট্টগ্রামের দুই রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পৃথকভাবে যাচাই-বাছাই শুনানি শুরু হয়। চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন চট্টগ্রাম-৮ ও চট্টগ্রাম-৯ আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই করেন। অপরদিকে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা চট্টগ্রাম-১৩ আসনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ শুনানি ও নথিপত্র পর্যালোচনার পর নির্বাচন আইন ও বিধিমালার আলোকে কয়েকজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের শুনানিতে সবচেয়ে আলোচিত সিদ্ধান্ত আসে চট্টগ্রাম-৯ আসনকে কেন্দ্র করে। এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত প্রার্থী ডা. ফজলুল হকের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তার দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাঁর দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী মনোনয়নটি বাতিল করা হয়েছে। ডা. ফজলুল হকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব থাকার তথ্য যাচাই-বাছাইয়ে উঠে আসে, যা বাংলাদেশের নির্বাচন আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বিবেচিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম-৯ আসনেই আরও তিনজন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের প্রার্থী আব্দুল আবুল মোমেন চৌধুরীর মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষর সংক্রান্ত অসঙ্গতি পাওয়া যায়। নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া কাগজপত্রে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষরের মিল না থাকায় তাঁর মনোনয়ন গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হয়নি। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মিলন কান্তি শর্মার মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয় প্রস্তাবক ও সমর্থকের তালিকায় প্রয়োজনীয় এক শতাংশ ভোটারের তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন না করার কারণে। নাগরিক ঐক্যের প্রার্থী নুরুল আবছারের ক্ষেত্রেও মনোনয়ন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ রয়েছে এবং সিটি করপোরেশনের কর বকেয়ার বিষয়টি শুনানিতে প্রমাণিত হয়েছে।

চট্টগ্রাম-৮ আসনেও যাচাই-বাছাই শেষে দুটি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী শেহাব উদ্দিনের মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরের অসামঞ্জস্য ধরা পড়ে। জমা দেওয়া কাগজপত্রে স্বাক্ষরের মিল না থাকায় নির্বাচন বিধিমালার আলোকে তাঁর মনোনয়ন বাতিল করা হয়। একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আজাদ চৌধুরীর মনোনয়নপত্রও বাতিল করা হয়েছে। তাঁর ক্ষেত্রে এক শতাংশ ভোটারের তালিকায় তথ্যগত ত্রুটি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে অসংগতি পাওয়ায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

অন্যদিকে চট্টগ্রাম-১৩ আসনে যাচাই-বাছাই শেষে আরও দুটি মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। আনোয়ারা-কর্ণফুলী আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আলী আব্বাসের মনোনয়নপত্র দলীয় মনোনয়ন সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বাতিল করা হয়েছে। দলীয় প্রত্যয়নপত্র ও মনোনয়ন সংক্রান্ত নথিতে প্রয়োজনীয় বৈধতা না থাকায় নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁর প্রার্থিতা বাতিল হয়। একই আসনে গণঅধিকারের প্রার্থী মো. মুজিবুর রহমানের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে ঋণখেলাপি হওয়ার অভিযোগের ভিত্তিতে। শুনানিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নথি যাচাই করে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান রিটার্নিং কর্মকর্তা।

মনোনয়নপত্র বাতিলের এই সিদ্ধান্তগুলো নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি আবারও সামনে এনেছে। নির্বাচন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, বরং কেবল আইন ও বিধিমালাই অনুসরণ করা হয়েছে। যেসব প্রার্থীর মনোনয়নপত্রে অসংগতি পাওয়া গেছে, তাদের ক্ষেত্রেই কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

এদিকে মনোনয়ন বাতিলের খবরে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এই সিদ্ধান্তকে স্বচ্ছ ও নিয়মতান্ত্রিক বলে স্বাগত জানিয়েছেন, আবার কেউ কেউ একে রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করছেন। জামায়াতে ইসলামীর স্থানীয় নেতারা ডা. ফজলুল হকের মনোনয়ন বাতিলের বিষয়ে আপিলের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। অন্য দলগুলোর পক্ষ থেকেও আইনি লড়াইয়ের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে একাধিক প্রার্থীর মনোনয়ন বাতিল নির্বাচনের মাঠে নতুন সমীকরণ তৈরি করবে। অনেক আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমে আসতে পারে, আবার কোথাও নতুন প্রার্থীদের জন্য সুযোগ তৈরি হবে। একই সঙ্গে এই ঘটনা ভোটারদের মধ্যেও আগ্রহ ও কৌতূহল বাড়াবে বলে মনে করছেন তারা।

মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা গেলে, মনোনয়ন বাতিল হওয়া প্রার্থীদের জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা। দীর্ঘ প্রস্তুতি, প্রচেষ্টা ও সমর্থকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা এক মুহূর্তে অনিশ্চয়তায় পড়ে গেছে। তবে নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের জন্য আইনানুগ কঠোরতা অপরিহার্য, আর সেটিই শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।

চট্টগ্রামে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের এই পর্ব শেষ হলেও সামনে আপিল ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া এখনও বাকি রয়েছে। ফলে আগামী কয়েক দিন চট্টগ্রামের রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তাপ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই এই সিদ্ধান্তগুলোর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com