গ্রিনল্যান্ড দখলের ট্রাম্প পরিকল্পনায় চাপে ইউরোপ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫৫ বার
গ্রিনল্যান্ড দখল পরিকল্পনা

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই একের পর এক আগ্রাসী ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার সাম্প্রতিক ঘোষণাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে উঠেছে ডেনমার্কের অধীন স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড দখলের পরিকল্পনা। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানের মাধ্যমে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে আসার ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের দৃঢ় অবস্থান ইউরোপজুড়ে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপ শুধু ইউরোপ-আমেরিকা সম্পর্কেই নয়, বরং ন্যাটোর ভবিষ্যৎ ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে।

চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র মাদক সন্ত্রাসের অভিযোগে ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক আটক করে। পরদিনই তাকে নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনের একটি আদালতে হাজির করা হয়। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অনেকেই একে যুক্তরাষ্ট্রের একতরফা শক্তি প্রয়োগের নজির হিসেবে দেখেন। ঠিক এই ঘটনার একদিন পরই ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন এবং প্রয়োজনে তা দখল করা হবে।

ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, আর্কটিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা, রাশিয়া ও চীনের উপস্থিতি এবং খনিজ সম্পদের কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য। তার ভাষায়, “গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের দরকার, এটি আমাদের জাতীয় স্বার্থের প্রশ্ন।” এই বক্তব্য শুধু ডেনমার্ক নয়, পুরো ইউরোপকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। কারণ গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অংশ এবং ডেনমার্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিফেন মিলারও এই অবস্থানকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসনের শুরু থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান স্পষ্ট—গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হওয়া উচিত। তার মতে, এটি কোনো নতুন ধারণা নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের অংশ।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভেনেজুয়েলার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র যে শক্তি প্রয়োগ করেছে, সেটি আসলে পশ্চিম গোলার্ধে আধিপত্য বিস্তারের ট্রাম্প প্রশাসনের দৃঢ় সংকল্পের বহিঃপ্রকাশ। থিঙ্ক ট্যাঙ্ক আটলান্টিক কাউন্সিলের উত্তর ইউরোপ বিষয়ক পরিচালক আনা উইসল্যান্ডার আল জাজিরাকে বলেন, ভেনেজুয়েলায় সফল সামরিক হস্তক্ষেপের পরপরই গ্রিনল্যান্ড দখলের ঘোষণা এবং অন্যান্য দেশের বিরুদ্ধে শক্তি ব্যবহারের হুমকি ইউরোপ ও ন্যাটোর জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার মতে, এটি শুধু একটি ভূখণ্ড দখলের প্রশ্ন নয়, বরং পুরো আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিয়ম-কানুনকে চ্যালেঞ্জ করার সামিল।

ডেনিশ প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডারিকসন ৪ জানুয়ারি দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ট্রাম্প যখন গ্রিনল্যান্ড দখলের কথা বলেন, তখন সেটিকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি স্পষ্টভাবে সতর্ক করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ন্যাটো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তাহলে ন্যাটো জোট কার্যত ভেঙে পড়বে। তার ভাষায়, এটি ন্যাটোর জন্য ‘মৃত্যুঘণ্টা’ ডেকে আনবে।

ডেনিশ প্রধানমন্ত্রীর এই আশঙ্কার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন আনা উইসল্যান্ডার। তিনি বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহার করে, তাহলে ন্যাটোর অনুচ্ছেদ ৫ অর্থহীন হয়ে যাবে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো সদস্য রাষ্ট্র আক্রান্ত হলে অন্য সব সদস্য তার পাশে দাঁড়াতে বাধ্য। কিন্তু যদি আক্রমণকারী নিজেই ন্যাটোর প্রধান শক্তি হয়, তাহলে সম্মিলিত প্রতিরক্ষার ধারণাই ভেঙে পড়বে।

শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতির খ্যাতনামা অধ্যাপক জন মিয়ারশাইমার আরও কঠোর ভাষায় সতর্ক করেছেন। তার মতে, ট্রাম্প যদি গ্রিনল্যান্ড দখলে এগিয়ে যান, তাহলে ন্যাটো নিজেই নিজের ছায়ায় পরিণত হবে। কার্যত এই জোটের অস্তিত্ব তখন প্রশ্নের মুখে পড়বে। তিনি বলেন, এটি শুধু ন্যাটোর নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী পুরো নিরাপত্তা ব্যবস্থার অবসান ডেকে আনতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের অবস্থান অনেকটাই দ্বিধাগ্রস্ত। একদিকে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঐতিহাসিক জোট ও নিরাপত্তা সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে ট্রাম্পের আগ্রাসী নীতির বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিতে সাহস পাচ্ছে না। সম্প্রতি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের নেতারা প্যারিসে হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ইউক্রেনের নিরাপত্তা ইস্যুতে বৈঠক করলেও সেখানে ভেনেজুয়েলা বা গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এটি ইউরোপের কূটনৈতিক অসহায়ত্বেরই প্রতিফলন।

রাশিয়ার দিক থেকেও এই পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ন্যাটো দুর্বল হলে ইউক্রেনে আরও আগ্রাসী হতে পারে মস্কো। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। চীনও নীরবে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সুযোগ বুঝে সেখানে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান শক্ত করতে পারে।

গ্রিনল্যান্ডের জনগণের অবস্থানও এই সংকটে গুরুত্বপূর্ণ। তারা দীর্ঘদিন ধরে স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি নিজেদের পরিচয় ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সচেতন। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি দখল পরিকল্পনা তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ তৈরি করেছে। অনেক গ্রিনল্যান্ডবাসী মনে করছেন, বড় শক্তিগুলোর কৌশলগত খেলায় তাদের ভূখণ্ড ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

সব মিলিয়ে, গ্রিনল্যান্ড দখলের প্রশ্নে ডোনাল্ড ট্রাম্পের দৃঢ় অবস্থান ইউরোপকে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতো প্রধান মিত্রের আগ্রাসী নীতির সামনে ইউরোপ কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, এই সংকট শুধু একটি ভূখণ্ড নিয়ে নয়; এটি বিশ্ব রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য, জোটব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভবিষ্যৎ নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com