হাতিয়ায় ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বিএনপি–এনসিপি সংঘর্ষ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৮ বার
হাতিয়ায় বিএনপি–এনসিপি সংঘর্ষ, আহত ৯

প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে উভয় পক্ষের অন্তত নয়জন আহত হয়েছেন। শুক্রবার রাতে সংঘটিত এই ঘটনার পর এলাকায় চরম উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করেছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

স্থানীয় প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার রাত সাড়ে আটটার দিকে উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের দরবেশ বাজার এলাকায় এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এর আগে বিকেল থেকেই এলাকায় উত্তেজনার সূত্রপাত হয়। অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্য দিয়ে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যায় এবং একপর্যায়ে তা সহিংস রূপ নেয়।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, চানন্দী ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী করিম বাজার–দরবেশ বাজার এলাকায় একটি পিচঢালাই রাস্তার ইট তুলে নেওয়ার অভিযোগ এনে এনসিপির এক স্থানীয় নেতা ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। ওই পোস্টে স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম উল্লেখ করে রাস্তা কেটে ইট, বালু ও পাথর বিক্রির অভিযোগ তোলা হয়। পোস্টটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পরপরই এলাকায় আলোচনা ও উত্তেজনা শুরু হয়। বিএনপির নেতাকর্মীরা অভিযোগটিকে মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।

সন্ধ্যার পর এনসিপির ওই নেতা ও তার সহযোগীরা দরবেশ বাজার এলাকায় লিফলেট বিতরণ শুরু করলে বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে তাদের কথা কাটাকাটি হয়। স্থানীয়রা জানান, শুরুতে উভয় পক্ষের মধ্যে বাগ্‌বিতণ্ডা হলেও কিছুক্ষণের মধ্যেই পরিস্থিতি হাতাহাতিতে রূপ নেয়। পরে উভয় পক্ষ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়। সংঘর্ষ চলাকালে বাজার এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বন্ধ হয়ে যায়।

এই সংঘর্ষে এনসিপির সাতজন ও বিএনপির দুইজন আহত হন। আহতদের মধ্যে এনসিপির চানন্দী ইউনিয়ন আহ্বায়ক জাকের হোসেন, হাতিয়া উপজেলা জাতীয় যুবশক্তির যুগ্ম আহ্বায়ক আলমগীর হোসেন ও আরিফ হোসেন, ছাত্রশক্তির রবিন এবং এনসিপি নেতা জাফের, দুলাল ও শাহাদাত রয়েছেন। বিএনপির আহতরা হলেন সারওয়ার ও সাইফুল ইসলাম সারু। আহতদের মধ্যে কয়েকজনকে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে এবং গুরুতর আহতদের নোয়াখালী ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

ঘটনার পর এনসিপির পক্ষ থেকে দেওয়া এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে অভিযোগ করা হয়, চানন্দী ইউনিয়নের নদীর তীরে করিম বাজার এলাকার একটি পিচঢালাই রাস্তা কেটে ইট, বালু ও পাথর বিক্রি করছিল স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা। এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে এনসিপির নেতাকর্মীরা বাড়ি ফেরার পথে পূর্বপরিকল্পিতভাবে বিএনপির সশস্ত্র লোকজন তাদের ওপর হামলা চালায়। প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, হামলার সময় এনসিপির অন্তত আটটি মোটরসাইকেল লুট করা হয়েছে এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিএনপির পক্ষ থেকেও পৃথক এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এনসিপির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করা হয়। বিএনপি নেতারা দাবি করেন, দরবেশ বাজার এলাকার বালু ব্যবসায়ী জাকের ব্যাপারী ও ইঞ্জিনিয়ার তানবিরের লোকজন স্থানীয়দের দাবির মুখে বালু পরিবহনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা মেরামতের কাজ করছিলেন। সেই সময় এনসিপির লোকজন ভিডিও ধারণ করে বিএনপির নেতাকর্মীরা মাটি ও রাস্তার উপকরণ বিক্রি করছে—এমন মিথ্যা প্রচারণা চালায়।

বিএনপির প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ওই সময় চানন্দী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি এবং বর্তমানে এনসিপি নেতা নূর আলম রিপনের নেতৃত্বে এনসিপির লোকজন দেশীয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এতে বিএনপির নেতা সারওয়ার ও প্রতিবন্ধী সাইফুল ইসলাম সারু আহত হন। বিএনপির পক্ষ থেকে এই হামলার নিন্দা জানিয়ে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

সংঘর্ষের খবর পেয়ে রাতেই হাতিয়া থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল আলম বলেন, ঘটনার পরপরই পুলিশ সেখানে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। বর্তমানে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। তিনি আরও বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে স্থানীয় বাসিন্দারা সংঘর্ষের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট থেকে এমন সহিংস পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। তারা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ না থাকলে সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। বাজার এলাকায় সংঘর্ষের সময় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে পড়েন এবং অনেকেই নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া অভিযোগ বা বক্তব্য যাচাই-বাছাই ছাড়াই দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় উত্তেজনা বাড়ছে। এর সঙ্গে রাজনৈতিক বিভাজন যুক্ত হলে সহিংসতার ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। তারা বলেন, স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের উচিত এমন ঘটনায় দ্রুত হস্তক্ষেপ করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা।

হাতিয়ার মতো একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলায় এ ধরনের রাজনৈতিক সংঘর্ষ স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলেও মনে করছেন সচেতন মহল। বাজারকেন্দ্রিক এলাকাগুলোতে সহিংসতা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও এলাকাবাসী এখনো শঙ্কামুক্ত নয়। তারা আশা করছেন, প্রশাসন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শনাক্ত করবে এবং আইনের আওতায় আনবে। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছেন, ভবিষ্যতে যেকোনো অভিযোগ বা বিরোধ আলোচনার মাধ্যমে মীমাংসা করার জন্য।

এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও স্পষ্ট হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি পোস্টও কীভাবে বাস্তব জীবনে বড় ধরনের সংঘাতের জন্ম দিতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি ছাড়া এমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে—এমনটাই মনে করছেন স্থানীয়রা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত