গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ইউরোপকে ১০০% শুল্কের হুমকি ট্রাম্পের

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
গ্রিনল্যান্ড ইস্যু ট্রাম্প শুল্ক হুমকি

প্রকাশ: ২০ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

গ্রিনল্যান্ডকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবির বিরোধিতা করলে ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি ‘১০০ শতাংশ’ বাস্তবায়ন করা হবে বলে স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এই বক্তব্যের পরপরই ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়ে দিয়েছে, অর্থনৈতিক চাপ বা রাজনৈতিক হুমকির কাছে নতি স্বীকার না করে তারা নিজেদের সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ ও কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।

সোমবার (১৯ জানুয়ারি) মার্কিন গণমাধ্যম এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটোভুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো যদি গ্রিনল্যান্ড প্রশ্নে তাঁর অবস্থানের বিরোধিতা করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া তাদের সব পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আমি এটি করবো—১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন করবো।” ট্রাম্পের এই মন্তব্য ইউরোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে। এরপর ১ জুন থেকে এই হার বাড়িয়ে ২৫ শতাংশ করা হবে। ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক ব্যবস্থা বহাল থাকবে বলে তিনি জানান। শুধু যুক্তরাজ্য নয়, একই নীতি ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তাঁর ভাষায়, গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের অবস্থান নতুন নয়। এর আগেও তিনি প্রকাশ্যে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে এবার সেই দাবি ঘিরে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রকাশ্য হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর ওপর একযোগে শুল্ক আরোপ হলে বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।

ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রিনল্যান্ডের সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে ইউরোপীয় দেশগুলো একযোগে শক্ত অবস্থান নিয়েছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, হুমকি দিয়ে বা অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগ করে গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করা যায় না। তিনি স্পষ্ট করে জানান, এই বিষয়ে কিছু ‘লাল রেখা’ রয়েছে, যা অতিক্রম করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর মতে, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এবং সেখানকার জনগণের ইচ্ছাই ভবিষ্যৎ নির্ধারণের একমাত্র বৈধ ভিত্তি।

যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারও একই সুরে কথা বলেন। তিনি বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল গ্রিনল্যান্ডবাসী ও ডেনমার্কের। যুক্তরাজ্য আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্বের নীতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় এবং কোনো ধরনের হুমকি বা শুল্ক আরোপের মাধ্যমে এই নীতি ভাঙা উচিত নয়।

সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি নাকচ করেননি। এ বিষয়ে সরাসরি প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই।” তাঁর এই বক্তব্য ইউরোপীয় নিরাপত্তা মহলে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ডেনমার্ক সতর্ক করে জানায়, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক পদক্ষেপ ন্যাটোর জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে এবং জোটের ভেতরে অভূতপূর্ব সংকট সৃষ্টি হতে পারে।

ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে বলেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা নিয়ে জোটটি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখবে। তিনি জানান, আর্কটিক অঞ্চলের ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে এবং সেখানে যেকোনো উত্তেজনা ন্যাটোর সম্মিলিত নিরাপত্তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ইউরোপের কয়েকটি দেশ প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে সীমিত সংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে, যাতে সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তাদের অবস্থান স্পষ্ট হয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, ইইউ সংঘাতে যেতে চায় না, তবে নিজেদের অবস্থান থেকেও সরে আসবে না। তাঁর ভাষায়, “বাণিজ্যিক হুমকি কোনো সমাধান নয়। সার্বভৌমত্ব কখনোই বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের কৌশলগত সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন নিজের স্বার্থ ও নীতিগত অবস্থান রক্ষায় আপস করবে না।

এই পরিস্থিতিতে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে করণীয় নির্ধারণে আগামী বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে। বৈঠকে সম্ভাব্য পাল্টা বাণিজ্যিক ব্যবস্থা, কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং ন্যাটোর ভেতরে সমন্বয়ের বিষয়গুলো আলোচনায় আসবে বলে জানা গেছে। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, এই বৈঠকই নির্ধারণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের হুমকির জবাবে ইইউ কতটা কঠোর অবস্থান নেয়।

এর মধ্যেই ট্রাম্প ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের মধ্যে বার্তা বিনিময়ের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে এনেছে। বার্তায় ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার জন্য নরওয়েকে দায়ী করেন। জবাবে প্রধানমন্ত্রী স্টোর কূটনৈতিক ভাষায় জানান, নোবেল শান্তি পুরস্কার একটি স্বাধীন কমিটি দিয়ে থাকে, নরওয়ে সরকার নয়। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এবং নরওয়ে এই বিষয়ে ডেনমার্কের অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন করে।

এদিকে নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড) জানিয়েছে, গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেসে একাধিক বিমান পাঠানো হয়েছে। তবে নোরাডের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে পূর্বপরিকল্পিত নিয়মিত কার্যক্রম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জানানো হয়, এই কার্যক্রম সম্পর্কে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষকে আগেই অবহিত করা হয়েছিল এবং অতীতেও ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একই ধরনের তৎপরতা চালানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু শুধু একটি ভূখণ্ডগত প্রশ্ন নয়; এটি আর্কটিক অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা, প্রাকৃতিক সম্পদের নিয়ন্ত্রণ এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে আর্কটিক অঞ্চলে নতুন নৌপথ ও সম্পদের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় এই অঞ্চল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও অন্যান্য শক্তিধর দেশের আগ্রহ বেড়েছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের হুমকি সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন।

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন দিকে মোড় নেয়, তা নির্ভর করবে আসন্ন কূটনৈতিক আলোচনা ও ইইউ নেতাদের সিদ্ধান্তের ওপর। তবে এক বিষয় স্পষ্ট—গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান এবং ইউরোপের ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনার রেখা টেনে দিয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com