নীরব ঘাতক অভ্যাসে বিপন্ন হৃদযন্ত্র

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৪ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ৫২ বার
নীরব ঘাতক অভ্যাসে বিপন্ন হৃদযন্ত্র

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

এক সময় হৃদরোগকে বার্ধক্যজনিত রোগ বলেই মনে করা হতো। ধারণা ছিল, বয়স বাড়লেই ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্র দুর্বল হবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাস্তবতা সেই ধারণাকে পুরোপুরি ভুল প্রমাণ করেছে। এখন হৃদরোগ আর শুধু প্রবীণদের সমস্যা নয়; তরুণ, কর্মজীবী এমনকি শিক্ষার্থীদের মধ্যেও হার্ট অ্যাটাক ও হৃদরোগের ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। বিশেষ করে ঘুমের মধ্যেই আচমকা হার্ট অ্যাটাক বা আকস্মিক মৃত্যুর ঘটনা চিকিৎসক সমাজকে গভীর উদ্বেগে ফেলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে স্থূলত্ব, উচ্চ কোলেস্টেরল ও থাইরয়েডজনিত সমস্যা। এসব রোগ সরাসরি কিংবা পরোক্ষভাবে হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। চিকিৎসকদের মতে, জিনগত কারণের পাশাপাশি দৈনন্দিন জীবনযাপনের কিছু অভ্যাসই আজকাল হৃদরোগের বড় ট্রিগার হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ বুঝতেই পারছে না, কোন কোন অভ্যাস ধীরে ধীরে তার হার্টের ক্ষতি করছে।

লন্ডনের খ্যাতনামা হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ জেরেমি লন্ডন এই বিষয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ পরিচিত মুখ। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি নিয়মিত হার্ট সুস্থ রাখার বিষয়ে সতর্কবার্তা ও পরামর্শ দিয়ে থাকেন। তাঁর মতে, এমন কিছু অভ্যাস আছে যেগুলোকে আমরা অনেক সময় হালকাভাবে দেখি, কিন্তু সেগুলোর ক্ষতিকর প্রভাব হৃদযন্ত্রের জন্য মারাত্মক হতে পারে।

জেরেমি লন্ডনের মতে, মদ্যপান হৃদযন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক অভ্যাসগুলোর একটি। লাভ-ক্ষতির নিরিখে তিনি একে ১০-এর মধ্যে ১০ নম্বর দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, অ্যালকোহল শরীরের প্রতিটি কোষের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, অল্প পরিমাণে মদ্যপান নিরাপদ কিংবা হৃদযন্ত্রের জন্য উপকারী। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা বলছে, অ্যালকোহলের কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই। নিয়মিত মদ্যপান উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের ছন্দের গোলমাল এবং হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ধূমপানও একইভাবে রক্তনালির ভেতরে প্রদাহ সৃষ্টি করে, রক্ত চলাচলে বাধা দেয় এবং ধীরে ধীরে হৃদযন্ত্রকে দুর্বল করে তোলে।

আরেকটি নীরব কিন্তু ভয়াবহ ঝুঁকির নাম একাকিত্ব। আধুনিক ব্যস্ত জীবনে একাকিত্ব এখন কেবল মানসিক সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি হৃদরোগেরও বড় কারণ হয়ে উঠছে। শুধু বয়স্ক মানুষ নয়, তরুণ প্রজন্মও সম্পর্কের টানাপোড়েন, কর্মচাপ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছে। এই একাকিত্ব থেকে জন্ম নেওয়া অবসাদ, উদ্বেগ ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ হৃদযন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, হৃদযন্ত্রের ক্ষেত্রে একাকিত্বের ক্ষতি ধূমপান বা স্থূলত্বের মতোই ভয়াবহ। জেরেমি লন্ডনের মূল্যায়নে একাকিত্বের ক্ষতির মাত্রা ১০-এর মধ্যে ৮।

খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রেও আধুনিক জীবনধারা হৃদযন্ত্রের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রক্রিয়াজাত বা প্যাকেটজাত মাংসের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে। ফাস্টফুড, হিমায়িত সসেজ, সালামি কিংবা বিভিন্ন ধরনের প্রক্রিয়াজাত মাংস সহজলভ্য হওয়ায় অনেকেই নিয়মিত এগুলো খাচ্ছেন। কিন্তু এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, সংরক্ষণকারী রাসায়নিক ও ক্ষতিকর চর্বি থাকে, যা রক্তে কোলেস্টেরল বাড়ায় এবং রক্তনালিকে শক্ত করে তোলে। জেরেমি লন্ডনের মতে, প্রক্রিয়াজাত মাংসের ক্ষতির মাত্রা ৫। শুধু হৃদরোগই নয়, এ ধরনের খাবারে কোলন ক্যান্সার ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়ে। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, প্রক্রিয়াজাত মাংস এড়িয়ে টাটকা ও কম চর্বিযুক্ত মাংস বেছে নেওয়া উচিত।

আধুনিক জীবনে প্লাস্টিকের ব্যবহার যেন অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গেছে। রান্নাঘরের কাটিং বোর্ড, খাবারের কৌটো, পানির বোতল কিংবা বাসন—সবখানেই প্লাস্টিক। কিন্তু এই প্লাস্টিক থেকেই আসছে আরেকটি নীরব বিপদ। খাবারের সঙ্গে মিশে যাওয়া মাইক্রোপ্লাস্টিক শরীরে ঢুকে হৃদযন্ত্রের ক্ষতি করতে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। শুধু তাই নয়, মাইক্রোপ্লাস্টিক হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে, যার প্রভাব পড়ে প্রজনন ক্ষমতার ওপরও। এই কারণেই প্লাস্টিক ব্যবহারের ক্ষতিকর দিককে জেরেমি লন্ডন ক্ষতির স্কেলে ৫ নম্বর দিয়েছেন।

চিকিৎসকদের মতে, এসব অভ্যাসের প্রভাব এক দিনে বোঝা যায় না। ধীরে ধীরে, বছরের পর বছর ধরে এগুলো হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। একসময় হঠাৎ করেই দেখা দেয় মারাত্মক পরিণতি। তরুণ বয়সে শরীর তুলনামূলকভাবে শক্ত থাকায় অনেকেই উপসর্গ উপেক্ষা করেন। কিন্তু এই অবহেলাই ভবিষ্যতে বড় বিপদের কারণ হতে পারে।

হৃদযন্ত্র সুস্থ রাখতে চিকিৎসকেরা জীবনযাপনে কিছু মৌলিক পরিবর্তনের ওপর জোর দিচ্ছেন। নিয়মিত ঘুম, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম এবং সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখা—এই বিষয়গুলো এখন আর বিলাসিতা নয়, বরং প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে মানুষের চলাফেরা কমে গেছে, পর্দার সামনে সময় বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অস্বাস্থ্যকর খাবার ও মানসিক চাপ। সব মিলিয়ে হৃদযন্ত্র যেন প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য যুদ্ধে লড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হৃদরোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা। কোন অভ্যাসগুলো ক্ষতিকর, তা জানা এবং সময় থাকতেই সেগুলো পরিহার করা জরুরি। কারণ হৃদযন্ত্র একবার বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়লে তা পুরোপুরি সারিয়ে তোলা অনেক সময় সম্ভব হয় না। তাই সুস্থ থাকতে হলে আজই জীবনযাপনের দিকে নতুন করে তাকাতে হবে। হার্টের যত্ন মানেই কেবল রোগের চিকিৎসা নয়, বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট অভ্যাস বদলে নেওয়ার সাহস।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com