ভুল ম্যাট্রেস কি পিঠ ব্যথার নীরব কারণ?

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬
  • ১০৭ বার
ভুল ম্যাট্রেস কি পিঠ ব্যথার নীরব কারণ?

প্রকাশ: ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রাতে পর্যাপ্ত সময় ঘুমানোর পরও যদি সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই পিঠ, কোমর বা ঘাড়ে ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে অনেকেই এর কারণ খোঁজেন দৈনন্দিন কাজের চাপ, বয়সজনিত সমস্যা কিংবা হঠাৎ কোনো শারীরিক জটিলতায়। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যথার একটি বড় এবং প্রায়ই উপেক্ষিত কারণ হতে পারে বিছানার ম্যাট্রেস। ভুল ম্যাট্রেসে নিয়মিত ঘুমালে ধীরে ধীরে মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে পিঠ ব্যথা, কোমর ব্যথা এমনকি ঘাড়ের সমস্যার জন্ম দেয়।

মানুষ জীবনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় কাটায় ঘুমের মধ্যে। শুধু ঘুমানোই নয়, অনেক সময় বিছানায় বসে কাজ করা, বই পড়া বা বিশ্রাম নেওয়ার অভ্যাসও রয়েছে। তাই বিছানা ও ম্যাট্রেসের মান সরাসরি আমাদের শরীরের ওপর প্রভাব ফেলে। অনেকেই মনে করেন, ম্যাট্রেস যত নরম ও আরামদায়ক হবে, ততই ভালো ঘুম হবে। বাস্তবে বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অতিরিক্ত নরম ম্যাট্রেসে শোয়ার সময় শরীর প্রথমে আরাম পেলেও, কিছুক্ষণের মধ্যেই মেরুদণ্ডের স্বাভাবিক সোজা অবস্থান নষ্ট হতে শুরু করে।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, খুব নরম ম্যাট্রেসে শোয়ার ফলে শরীরের ভারী অংশ, যেমন কোমর ও নিতম্ব, বিছানার ভেতরে বেশি ঢুকে যায়। এতে মেরুদণ্ড বেঁকে থাকে এবং পেশির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ফলস্বরূপ রাতভর পেশি শিথিল হওয়ার বদলে উল্টো টান সৃষ্টি হয়। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সেই টান থেকেই ব্যথা অনুভূত হয়। আবার অত্যন্ত শক্ত ম্যাট্রেসেও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। অতিরিক্ত শক্ত বিছানায় শরীরের স্বাভাবিক বক্রতা ঠিকভাবে সমর্থন পায় না, ফলে চাপের জায়গাগুলোতে অস্বস্তি তৈরি হয়।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব মানুষকে খুব শক্ত ম্যাট্রেসে ঘুমাতে দেওয়া হয়েছিল, তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে ঘুমের মান খারাপ হয়েছে, যদিও পিঠ বা কোমরে তেমন ব্যথা অনুভূত হয়নি। আবার মাঝারি শক্ত বা আধা-নরম ম্যাট্রেসে ঘুমানো ব্যক্তিদের অনেকেরই ঘুম তুলনামূলক ভালো হলেও সকালে উঠেই পিঠ ব্যথার অভিযোগ দেখা গেছে। এসব গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, সবার জন্য একই ধরনের ম্যাট্রেস উপযোগী নয়। ব্যক্তির ওজন, শারীরিক গঠন, ঘুমানোর ভঙ্গি এবং বিদ্যমান শারীরিক সমস্যার ওপর ম্যাট্রেসের উপযুক্ততা নির্ভর করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো মানের ম্যাট্রেস এমন হওয়া উচিত যা শরীরের স্বাভাবিক গঠনকে সমর্থন দেবে। অর্থাৎ মেরুদণ্ড যেন ঘাড় থেকে কোমর হয়ে পায়ের নিচের অংশ পর্যন্ত একটি সোজা রেখায় থাকে। উন্নতমানের ম্যাট্রেস সাধারণত নিচে বসে যায় না এবং শরীরের চাপ অনুযায়ী নিজেকে সামঞ্জস্য করতে পারে। এতে পেশির অপ্রয়োজনীয় টান কমে, রক্ত সঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে এবং ঘাড় ও পিঠের ব্যথা উপশম হতে পারে।

এই কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে অর্থোপেডিক ম্যাট্রেসের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। চিকিৎসকদের মতে, অর্থোপেডিক ম্যাট্রেস মেরুদণ্ডের হাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে দেয় না। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন ধরে কোমর ব্যথা বা শিরদাঁড়ার সমস্যায় ভুগছেন, তাদের জন্য এই ধরনের ম্যাট্রেস উপকারী হতে পারে। নিয়মিত ব্যবহারে কোমরের ব্যথা কমার পাশাপাশি শরীরের ভারসাম্যও ভালো থাকে। তবে অর্থোপেডিক ম্যাট্রেস কেনার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি বলে মত দেন বিশেষজ্ঞরা।

যাদের শিরদাঁড়ায় পুরোনো ব্যথা, স্লিপ ডিস্ক বা অন্যান্য জটিলতা রয়েছে, তাদের জন্য পেইন কেয়ার ম্যাট্রেস কার্যকর হতে পারে। এই ম্যাট্রেসগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয় যাতে শরীরের সংবেদনশীল অংশগুলো অতিরিক্ত চাপ থেকে সুরক্ষিত থাকে। তবে শুধু বিজ্ঞাপন বা দাম দেখে ম্যাট্রেস কেনার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার পরামর্শ দিচ্ছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। কারণ দামি হলেই যে ম্যাট্রেস ভালো হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, অনেক পরিবার এখনও বিছানা বা ম্যাট্রেস নির্বাচনের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয় না। অনেক সময় পুরোনো বা নিম্নমানের ম্যাট্রেস বছরের পর বছর ব্যবহার করা হয়। এতে ধীরে ধীরে শরীরে ব্যথা বাড়তে থাকে, যা অনেকেই বয়সজনিত সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যান। অথচ সঠিক সময়ে ম্যাট্রেস পরিবর্তন করলে এই ব্যথার বড় একটি অংশ এড়ানো সম্ভব।

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণভাবে একটি ম্যাট্রেস পাঁচ থেকে আট বছর ব্যবহার উপযোগী। এর বেশি সময় ব্যবহার করলে ম্যাট্রেসের ভেতরের গঠন নষ্ট হয়ে যায়, যা চোখে না পড়লেও শরীরের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি নিয়মিত পিঠ ব্যথা অনুভূত হয়, তাহলে সেটি ম্যাট্রেস পরিবর্তনের একটি সতর্ক সংকেত হতে পারে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ভালো ঘুমের জন্য শুধু ঘুমের সময় বা পরিবেশই যথেষ্ট নয়, বরং সঠিক ম্যাট্রেস নির্বাচনও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নরম আরাম বা বাহারি বিজ্ঞাপনের ফাঁদে না পড়ে, নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে ম্যাট্রেস বেছে নেওয়াই হতে পারে পিঠ ব্যথা থেকে মুক্তির একটি কার্যকর উপায়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com