সংখ্যার গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের অধিকারেই জোর নতুন জনসংখ্যা নীতিতে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৫ জুলাই, ২০২৫
  • ১৬৭ বার

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

image-s3-key

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৫ | একটি বাংলাদেশ ডেস্ক | একটি বাংলাদেশ অনলাইন

জনসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অর্জন দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অনুকরণীয় হিসেবে বিবেচিত হলেও নতুন সময়ের নতুন চাহিদা, বাল্যবিবাহ, মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু, নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা এবং সমাজের জটিল বাস্তবতায় এক যুগ পর নতুন করে সাজানো হলো দেশের জনসংখ্যা নীতি। সংখ্যার হিসেবে নয়, মানুষের অধিকার, সম্মান, স্বেচ্ছা সম্মতি আর গোপনীয়তা—এবার এই মানবিক প্রশ্নগুলোকেই কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে ‘বাংলাদেশ জনসংখ্যা নীতি ২০২৫’।

গতকাল রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের বিশেষ আয়োজনে এই নতুন নীতি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। প্রতিবছর ১১ জুলাই দিবসটি পালিত হলেও অনিবার্য কারণে এবার একদিন পর উদযাপিত হলো। ২০১২ সালে ঘোষিত নীতির পরে এই নতুন নীতির মধ্য দিয়ে জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরিত করতে সরকারের নতুন অঙ্গীকারই যেন উঠে এসেছে।

নতুন জনসংখ্যা নীতির রূপকল্পে বলা হয়েছে, ‘পরিকল্পিত উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, জনমিতির লভ্যাংশকে কাজে লাগানো এবং একটি সুস্থ, সুখী, সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা।’ বাংলাদেশ এখনো জনমিতির লভ্যাংশের সুযোগ ভোগ করছে, যা ২০০৫ সালে শুরু হয়ে ২০৬১ সাল পর্যন্ত থাকবে। অর্থাৎ দেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী এখনো নির্ভরশীল মানুষের তুলনায় বেশি, যা অর্থনীতির জন্য বড় সুবিধা। তবে জনসংখ্যার সুবিধাকে কাজে লাগানোর জন্য প্রয়োজন সুপরিকল্পিত শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও সামাজিক নিরাপত্তা।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক মো. সায়েদুর রহমান, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা বিভাগের দুই সচিব, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের তিনজন মহাপরিচালক এবং ইউএনএফপিএর প্রতিনিধি। স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগম স্পষ্ট করে বলেন, পছন্দের পরিবার গড়তে হলে আগে তারুণ্যের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আর এজন্য প্রয়োজন মানসম্মত শিক্ষা, সচেতনতা আর একটি সহায়ক পরিবেশ, যেখানে তরুণরা সিদ্ধান্ত নিতে শিখবে।

২₂ পৃষ্ঠার নতুন নীতিতে ছয়টি মূল উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, অপূর্ণ পরিবার পরিকল্পনার চাহিদা কমানো, বাল্যবিবাহ ও মাতৃ-শিশুমৃত্যু হ্রাস, শিল্পবিপ্লবের নতুন ধাপগুলোর সুবিধা কাজে লাগানো, অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য হ্রাস এবং ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর কল্যাণ নিশ্চিত করা। এসব উদ্দেশ্য পূরণে বিভিন্ন কর্মকৌশলও নীতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

জনসংখ্যার সাম্প্রতিক চিত্রও এই নীতিতে তুলে ধরা হয়েছে। দেশে এখন প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ১১৯ জন মানুষ বসবাস করছে। মোট প্রজনন হার ২ দশমিক ৩ শতাংশে স্থিত। প্রতি হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যুর হার ৩১ আর মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ১৩৫। ১৫ বছর বা তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ এখনও বেকার, আর নারী শ্রমশক্তির অংশগ্রহণ এখনও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছায়নি। এসব বাস্তবতায় সরকার মনে করছে, পুরোনো স্লোগানধর্মী নীতি দিয়ে আর সমাধান হবে না।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নতুন নীতিতে আর ‘দুটি সন্তানই যথেষ্ট’ বা ‘দুটির বেশি নয়, একটি ভালো’ ধরনের স্লোগান রাখা হয়নি। এবার পরিবার পরিকল্পনার মুখ্য ভিত্তি হিসেবে রাখা হয়েছে সচেতনতা, অধিকার ও স্বেচ্ছা সম্মতি। জনসংখ্যাকে আর শূন্যপর্যায়ে নামিয়ে আনাই নয়, বরং জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করাই সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

নীতির পূর্বাভাস বলছে, বাংলাদেশের জনসংখ্যা ২০৬১ সালের পর আর বৃদ্ধি পাবে না। তখন দেশের জনসংখ্যা হবে আনুমানিক ২১ কোটি। ২০৬২ সাল থেকে জনসংখ্যা ঋণাত্মক হারে কমতে থাকবে এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত ক্রমেই বাড়বে। সেই সময়ের জন্য এখন থেকেই প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

এই নীতির প্রেক্ষাপটে নতুন করে প্রমাণ হলো, জনসংখ্যা আর শুধু ‘সংখ্যা’ নয়—মানুষের অধিকার, সম্মান ও অংশগ্রহণই এখন উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। এ নীতি শুধু কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা নিশ্চিত করাই এখন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত