ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে ইসি ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬
  • ৪০ বার
ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হলে ইসি ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি

প্রকাশ: ৯ ফেব্রুয়ারি  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন বহনের ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জারি করা নির্দেশনা প্রত্যাহার না করলে কমিশন ঘেরাওয়ের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। ঢাকা-১১ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম এই নির্দেশনাকে ‘ভোটাধিকার ও তথ্যের স্বাধীনতার পরিপন্থী’ বলে উল্লেখ করে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর মোহাম্মদপুর ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত এক নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে সাধারণ ভোটার, প্রার্থী কিংবা সাংবাদিকদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ করা একটি অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, এই নির্দেশনা আজকের মধ্যেই পরিবর্তন না হলে আগামী মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করা হবে।

এর আগে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) নির্বাচন কমিশন একটি নির্দেশনা জারি করে জানায়, ভোটগ্রহণের দিন ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের মধ্যে মোবাইল ফোন নিয়ে প্রবেশ করা যাবে না। তবে এই নিষেধাজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে ভোটকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, পুলিশ ইনচার্জ, আনসার সদস্য এবং ‘নির্বাচন সুরক্ষা ২০২৬’ অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহারকারী দুজন আনসার সদস্যকে। সাধারণ ভোটার, প্রার্থী বা তাদের এজেন্ট এবং সাংবাদিকদের ক্ষেত্রে এই ছাড় প্রযোজ্য নয়।

এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, “কার পরিকল্পনায়, কার স্বার্থে নির্বাচন কমিশন এমন নির্দেশনা জারি করছে—তা এখন জনগণের সামনে পরিষ্কার। আমরা কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছি, দিনের আলো থাকতে থাকতে এই বিধিনিষেধ সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা কঠোর কর্মসূচিতে যাব।”

নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এসে এই ধরনের নির্দেশনা ভোট কারচুপির পথ সুগম করার আশঙ্কা তৈরি করছে। তার ভাষায়, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধ করা মানে একদিকে সাংবাদিকদের কাজ সীমিত করা, অন্যদিকে ভোটারদের তথ্য জানার ও অনিয়মের প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ কেড়ে নেওয়া। তিনি বলেন, “মিডিয়াকে ব্ল্যাকআউট করা, মানুষের কণ্ঠরোধ করা এবং তথ্য অধিকার সীমিত করার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।”

এনসিপি আহ্বায়ক আরও বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে ধৈর্য ধরেছেন এবং নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ রাখতে নানা অনিয়ম সহ্য করেছেন। কিন্তু ভোটের দ্বারপ্রান্তে এসে যদি নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতিত্বমূলক সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তার দায় কমিশনকেই নিতে হবে। তিনি নির্বাচন কমিশনকে উদ্দেশ করে বলেন, “১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণের দিন যদি কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব বা কারচুপির পরিকল্পনা থাকে, তাহলে এর পরিণতি অতীতের যেকোনো বিতর্কিত কমিশনের চেয়েও ভয়াবহ হবে।”

জনসভায় নাহিদ ইসলাম জানান, এই নির্দেশনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে তাদের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করে তারা এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানাবেন। তবে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান না হলে আন্দোলনের পথেই হাঁটার ঘোষণা দেন তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল নিষিদ্ধের বিষয়টি নতুন নয়, তবে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। অতীতের বিভিন্ন নির্বাচনে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ভোটকেন্দ্রের অনিয়ম, জাল ভোট বা সহিংসতার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেক সময় এসব তথ্যের ভিত্তিতেই প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে মোবাইল নিষেধাজ্ঞাকে কেউ কেউ অনিয়ম আড়াল করার কৌশল হিসেবেও দেখছেন।

অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভোটগ্রহণের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং ভোটকেন্দ্রের ভেতরে বিশৃঙ্খলা এড়াতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশনের একাধিক কর্মকর্তা অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, মোবাইল ফোন ব্যবহার করে ভোটের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য ক্ষতিকর। তবে এ বিষয়ে কমিশনের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা এখনো বিস্তারিতভাবে সামনে আসেনি।

মানবাধিকারকর্মী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, ভোটের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মোবাইল ফোনের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে নির্দিষ্ট বিধিনিষেধ বা নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থার মাধ্যমে দুই দিকই রক্ষা করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন।

ঢাকা-১১ আসনে নাহিদ ইসলাম ইতোমধ্যে একজন সরব ও আলোচিত প্রার্থী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তার এই বক্তব্য নির্বাচনী মাঠে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। জনসভায় উপস্থিত সমর্থকরা মোবাইল নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে স্লোগান দেন এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানান।

নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, ততই এমন বিতর্ক ও উত্তেজনা বাড়ছে। ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত ঘিরে যে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তাতে নির্বাচন কমিশন শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়। এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি বিধিনিষেধের প্রশ্ন নয়, বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং ভোটাধিকার রক্ষার সঙ্গে সরাসরি জড়িত—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত