২১ জুলাইয়ের আত্মত্যাগ: মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধে লেখা নতুন ইতিহাস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২১ জুলাই, ২০২৫
  • ৫৩ বার

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা
একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২১ জুলাই এখন আর শুধুই একটি তারিখ নয়—এটি এক সাহসী প্রতিরোধের প্রতীক, একটি ভয়াবহ রক্তাক্ত অধ্যায়ের স্মারক, যেখানে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগ প্রতিষ্ঠা করেছিল নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি। কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে উদ্ভূত এই গণঅভ্যুত্থান, যা শুরু হয়েছিল শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ হিসেবে, মাত্র চারদিনেই রূপ নেয় রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের ভয়ংকর এক ট্র্যাজেডিতে। এই আন্দোলনে পুলিশের গুলি, হামলা ও নিষ্ঠুর সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৪৮ জন মানুষ—সরকারি হিসাবে ২১ জুলাই শুধু একদিনেই নিহত হন ২৬ জন, যদিও বিভিন্ন বেসরকারি সূত্রে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

ঐতিহাসিক ২১ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠে আসে মাদরাসা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সম্মিলিত প্রতিরোধ। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী ছিল এই প্রতিরোধের কেন্দ্রবিন্দু। এখানে সেনাবাহিনী, র‍্যাব ও পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে তারা যে আত্মত্যাগ দেখিয়েছেন, তা স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে নজিরবিহীন। এই দিনটিকে স্মরণ করে “মাদরাসা শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধ দিবস” হিসেবে পালন করার উদ্যোগ নিয়েছেন বিভিন্ন সামাজিক ও নাগরিক সংগঠন। আয়োজন করা হচ্ছে আলোচনা সভা, ইতিহাস পুনর্নির্মাণমূলক প্রদর্শনী এবং প্রজন্ম-উন্মুখ কর্মসূচি, যাতে করে তরুণদের মনে দেশের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার চেতনা বেঁচে থাকে।

শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এক সমাবেশে বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কেবল কোটা সংস্কারের দাবি ছিল না—এটি ছিল বৈষম্য, শোষণ ও দমননীতির বিরুদ্ধে এক ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ। তার ভাষায়, যাত্রাবাড়ীতে গড়ে ওঠা মাদরাসা ছাত্রদের প্রতিরোধ ছিল “আজকের নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি।” সেই প্রতিরোধের চেতনা কেবল ইতিহাসের গর্ব নয়, বরং ভবিষ্যতের পথনির্দেশনা।

২১ জুলাই সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলে এক নির্মম দমন অভিযান। রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, বাড্ডা, শনির আখড়া, উত্তরা, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, সাভার ও নরসিংদীতে সেনা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হামলায় বহু আন্দোলনকারী নিহত হন। শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজেই সেদিন মৃত অবস্থায় আনা হয় ১৪ জনকে, যাদের মধ্যে ছিলেন ট্যুরিস্ট পুলিশের এসআই মুক্তাদির এবং ডিএমপির সদস্য গিয়াসউদ্দিন। গিয়াসউদ্দিনের লাশ পরে যাত্রাবাড়ীর ফুটওভার ব্রিজের নিচে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

নিহতদের মধ্যে ছিলেন কিশোর শুভ, মাদরাসা ছাত্র ইমাম হাসান তায়িম, যুবক আবদুল্লাহ আবির, শ্রমিক মেহেদী হাসান, রিকশাচালক রনি এবং সাধারণ পথচারীরা। এসব হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত ও রাষ্ট্রীয় দমননীতির সরাসরি বহিঃপ্রকাশ। অনেক লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়নি; হাসপাতাল সূত্র এবং পরিবারগুলোর বিবরণ থেকেই প্রমাণ মেলে নিহতের প্রকৃত চিত্রের।

আন্দোলনের নেতাদের বিরুদ্ধে শুরু হয় গুম ও গ্রেপ্তারের মহোৎসব। নাহিদ ইসলামকে ডিবি পুলিশের পরিচয়ে অজ্ঞাত ব্যক্তিরা তুলে নিয়ে যায়। পরে তার তিন সহকর্মী সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ ও হাসিব আল ইসলামকে তাঁদের অভিভাবকদের সামনেই গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ডিবি পুলিশ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ঘটনার দায় অস্বীকার করে, কিন্তু নিখোঁজদের সন্ধান দিতে ব্যর্থ হয়।

কারফিউ, সেনা মোতায়েন ও তিন দিনের জন্য ইন্টারনেট ও মোবাইল নেটওয়ার্ক বন্ধ করে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেওয়া হয়। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন করে যখন হামলা চালানো হচ্ছিল, তখন জাতিসংঘের হস্তক্ষেপ কিংবা আন্তর্জাতিক সহানুভূতি সংগ্রহ করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

সরকার ও প্রভাবশালী মিডিয়ার সমন্বয়ে চলতে থাকে বিভ্রান্তিমূলক প্রচার। আন্দোলনকে বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র বলে চালিয়ে দেওয়া হয়। আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সাজানো নাটক তৈরি হয়, যেখানে সরকারপন্থী দুর্বৃত্তরা সেতু ভবন, বিআরটিএ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ভবনে আগুন দিয়ে দায় চাপায় শিক্ষার্থীদের ওপর। অথচ, সরকারি সূত্রেই পরে এই হামলাগুলিকে ‘ছাত্রদের কাজ নয়’ বলে স্বীকার করা হয়। তবুও এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে চালানো হয় ব্যাপক দমন-পীড়ন।

এই প্রেক্ষাপটে, ২১ জুলাইয়ের সকালে সুপ্রিম কোর্ট কোটা পুনর্বহালের পক্ষে রায় দিলেও সরকার তা ঠেকাতে নেয় ‘লিভ টু আপিল’-এর আশ্রয়। এর আগেই আট দফা দাবিতে আন্দোলনকারীরা সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, যেখানে তারা নিহতদের বিচার ও ক্ষতিপূরণ, চাকরির নিরাপত্তা এবং কোটা সংস্কারে আইন প্রণয়নের দাবি জানান। কিন্তু সেই সমন্বয়কদের অনেককে পরে জোর করে বিবৃতি দিতে বাধ্য করা হয় বলে জানান কোটা সংস্কার আন্দোলনের অন্যতম নেতা আবদুল কাদের।

সরকারি বাহিনী এবং মিডিয়া ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই গণহত্যা আড়াল করার চেষ্টা চললেও বাস্তবতা হলো, ৩০০-এর বেশি নিহতের তথ্য এখনও বিভিন্ন সংগঠনের হাতে রয়েছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে এই সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

আজ ২১ জুলাই—একটি জাতীয় প্রতিরোধ দিবস, যা শুধুই একটি ঘটনার স্মরণ নয়। এটি ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দাবি জানায় মাদরাসা শিক্ষার্থীদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে। তারা ছিলেন না কোনো রাজনীতির অংশ, বরং ছিলেন এক শোষণহীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা। এই প্রতিরোধ, এই রক্তাক্ত অধ্যায়, বাংলাদেশের ইতিহাসে লেখা থাকবে অমোচনীয় কালিতে।

একটি বাংলাদেশ অনলাইন

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত