প্রকাশ: ২০ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দায়ের হওয়া এক মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে টানা ছয় দিন গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে ছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার Shirin Sharmin Chaudhury। এই সময়টি তিনি কাটিয়েছেন অত্যন্ত নীরব ও সংযতভাবে, যেখানে প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে তিনি কথা বলেননি বলে জানিয়েছে কারা কর্তৃপক্ষ।
গত ৭ এপ্রিল ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে। পরে লালবাগ থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে হাজির করা হলে রিমান্ড আবেদন করা হয়। তবে আদালত রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। সেই দিন রাতেই তাকে কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগারে নেওয়া হয়।
কারাগারে নেওয়ার পর তার জন্য ডিভিশন ভবনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষ প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। ৭ এপ্রিল থেকে ১২ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ওই কক্ষে অবস্থান করেন। পুরো সময়টিতে তিনি ছিলেন একা, কারণ সেখানে অন্য কোনো ডিভিশনপ্রাপ্ত নারী বন্দি ছিলেন না। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তার নিরাপত্তায় নারী কারারক্ষীরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন এবং শৃঙ্খলা অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ বজায় রাখা হয়।
কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাবেক স্পিকার কারাগারের পরিবেশে অত্যন্ত শান্ত ও সংযত আচরণ করেন। তিনি প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে কথা বলেননি এবং নিজের নির্ধারিত কক্ষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তার সেবার জন্য একজন সাজাপ্রাপ্ত নারী কয়েদিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, যিনি প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে সহযোগিতা করতেন।
কারাগারের নিয়ম অনুযায়ী ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিরা আলাদা সুবিধা পান, তবে চলাচল সীমিত থাকে। সেই নিয়ম অনুসারে তিনিও ডিভিশন ভবনের বাইরে যেতে পারেননি। ৮ এপ্রিল তার এক নিকট আত্মীয় কারাগারে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, যা নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে অনুমোদিত ছিল।
খাবার সরবরাহের ক্ষেত্রেও ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের জন্য নির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তাকে নির্ধারিত খাবারই সরবরাহ করা হয়েছে এবং বিশেষ কোনো আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। একই সঙ্গে তার স্বাস্থ্যগত দিক নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।
কারা মহাপরিদর্শক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ মো. মোতাহের হোসেন জানান, কারাগারে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসকরা তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তিনি সুস্থ ছিলেন এবং পরবর্তীতে জামিনে মুক্তির সময়ও তার শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল ছিল। তিনি আরও জানান, পূর্বে যে ওষুধ তিনি নিয়মিত সেবন করতেন, তা সংগ্রহ করে তাকে সরবরাহ করা হয়।
৭ এপ্রিল গ্রেপ্তারের কয়েক ঘণ্টা আগে তিনি ধানমন্ডির ৮/এ সড়কে তার চাচাতো ভাইয়ের বাসায় যান। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন যোগাযোগ না থাকলেও তিনি নিজেই ফোন করে সেখানে যাওয়ার কথা জানান এবং পছন্দের খাবার প্রস্তুত রাখতে বলেন। পরে রাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খাবার খেয়ে আলাপচারিতায় অংশ নেন তিনি।
সেই রাতেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ওই বাসায় উপস্থিত হন এবং তাকে গ্রেপ্তার করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তল্লাশির সময় তারা সহযোগিতা করেন এবং পরিস্থিতি শান্তভাবে মোকাবিলা করা হয়।
গত ১২ এপ্রিল সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তিনি জামিনে কারাগার থেকে মুক্তি পান। মুক্তির সময় তার স্বজনরা কারাগারের সামনে উপস্থিত ছিলেন। ছয় দিনের এই অবস্থান শেষে তিনি পুনরায় পরিবারের কাছে ফিরে যান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর তিনি ২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের স্পিকার পদ থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর থেকে তার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলতে থাকে। সাম্প্রতিক গ্রেপ্তার ও কারাবাস সেই আলোচনাকে আরও নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন সাবেক উচ্চপদস্থ রাষ্ট্রীয় ব্যক্তির কারাবাস সবসময়ই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে এই ক্ষেত্রে কারা ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং মানবিক আচরণ বজায় রাখা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করেছে।
কাশিমপুর কারাগারে তার ছয় দিনের অবস্থান এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কেউ এটিকে আইনি প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ বলছেন এটি দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রতিফলন।
সব মিলিয়ে, সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই কারাবাস কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং দেশের চলমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত একটি আলোচিত অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে