প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের তরুণ প্রজন্মকে বিশ্বমানের দক্ষ ও যোগ্য মানবসম্পদে রূপান্তর করতে শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেছেন, ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের ভিত্তি হবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর নির্ভর না করে বরং শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের দিকে বেশি গুরুত্ব দেবে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষা বাজেট নিয়ে গণস্বাক্ষরতা অভিযান আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। শিক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ রূপরেখা, বাজেট অগ্রাধিকার এবং শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, শিক্ষাবিদ ও উন্নয়নকর্মীরা অংশ নেন।
ববি হাজ্জাজ বলেন, বর্তমান বিশ্ব দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, বাস্তবমুখী ও দক্ষতা নির্ভর করতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, সরকার ভবিষ্যতে ‘শিখন নির্ভর’ বা লার্নিং বেইজড স্কুলিং ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের মুখস্থ নির্ভরতা কমিয়ে বিশ্লেষণমূলক ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে ধাপে ধাপে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত বিস্তৃত করার পরিকল্পনা করছে। তার মতে, শিক্ষার ভিত্তি যত শক্তিশালী হবে, ততই উচ্চশিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সক্ষমতা বাড়বে। তিনি বলেন, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান নিশ্চিত হয় না, বরং শিক্ষার্থীদের স্কুলে ধরে রাখা এবং নিয়মিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী আর্থিক সমস্যার কারণে পড়াশোনা থেকে ঝরে পড়ে, যা একটি বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সমস্যা সমাধানে আর্থিক প্রণোদনা ও সামাজিক সহায়তা কর্মসূচি আরও জোরদার করার প্রয়োজন রয়েছে। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে একটি দক্ষ ও উৎপাদনশীল জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি বলেন, আগামী জাতীয় বাজেটে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং কর্মসংস্থান খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি মনে করেন, একটি টেকসই উন্নয়ন কাঠামো গড়ে তুলতে হলে এই তিনটি খাতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
জোনায়েদ সাকি বলেন, বর্তমান বিশ্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা খাতে গুণগত পরিবর্তন না আনলে দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন অর্জন সম্ভব হবে না।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে শিক্ষা খাতে অগ্রগতি হলেও এখনও মানগত ব্যবধান রয়েছে। শহর ও গ্রামের মধ্যে শিক্ষার সুযোগ ও মানের পার্থক্য দূর করা জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক পাঠ্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
অনেক বক্তা মনে করেন, বর্তমান শ্রমবাজারে শুধু ডিগ্রি নয়, দক্ষতা এবং বাস্তব জ্ঞান সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা স্কুল পর্যায় থেকেই ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষার মানোন্নয়নে কাজ শুরু করেছে। ডিজিটাল শিক্ষা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, এখনো অনেক চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ ও পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে।
তিনি আরও বলেন, সরকারের লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে কোনো শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য নয়, বরং বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত হয়ে বের হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষক, অভিভাবক, নীতিনির্ধারক এবং সমাজের সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে আগামী এক দশকের মধ্যে দেশের মানবসম্পদ কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এজন্য ধারাবাহিক নীতি, পর্যাপ্ত বাজেট এবং কার্যকর বাস্তবায়ন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে শিক্ষা খাতে নতুন চিন্তা ও পরিকল্পনার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যা দেশের তরুণ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও সক্ষম করে তুলতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।