প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ফরাসি চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে জনপ্রিয় ফরাসি-মরক্কো অভিনেত্রী Nadia Farès-এর মৃত্যুতে। দীর্ঘ এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে অবশেষে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন এই গুণী শিল্পী। শুক্রবার (১৭ এপ্রিল) Paris-এর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৫৭ বছর।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গত কয়েকদিন ধরে তিনি কোমায় ছিলেন। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। তার দুই কন্যা সিলিয়া ও শানা চ্যাসম্যান এক যৌথ বিবৃতিতে মায়ের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করে বলেন, “ফ্রান্স একজন অসাধারণ শিল্পীকে হারিয়েছে, আর আমরা হারিয়েছি আমাদের প্রিয় মাকে।” তাদের এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু হৃদয়বিদারক বক্তব্যেই ফুটে উঠেছে ব্যক্তিগত শোকের গভীরতা এবং একই সঙ্গে একজন শিল্পীর প্রতি জাতির শ্রদ্ধা।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম Le Figaro-এর তথ্য অনুযায়ী, ১১ এপ্রিল একটি অপ্রত্যাশিত ঘটনার সূত্রপাত হয়। সেদিন প্যারিসের একটি স্পোর্টস কমপ্লেক্সের সুইমিংপুলে নাদিয়াকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। উপস্থিত এক সহসাঁতারু দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে সিপিআর প্রদান করেন। এরপর দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। চিকিৎসকেরা তার অবস্থা সংকটাপন্ন বিবেচনায় ‘মেডিক্যাল কোমা’য় রাখেন। কয়েকদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর অবশেষে শুক্রবার তার মৃত্যু হয়।
ঘটনার পরপরই স্থানীয় পুলিশ তদন্ত শুরু করলেও প্রাথমিকভাবে কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের আলামত পাওয়া যায়নি। ফলে এটি একটি দুর্ভাগ্যজনক স্বাস্থ্যগত ঘটনার ফল বলেই ধারণা করা হচ্ছে। তবে তদন্ত চলমান রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
মায়ের মৃত্যুতে বড় মেয়ে সিলিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তা শেয়ার করেন। সেখানে তিনি লিখেছেন, “জীবন যে কতটা দ্রুত বদলে যেতে পারে, তুমি আমাকে তা শিখিয়ে দিয়ে গেলে। তুমি আমাদের জন্য লড়াই করেছ, এজন্য তোমাকে ধন্যবাদ।” এই কথাগুলোতে ফুটে উঠেছে একজন সন্তানের অসীম ভালোবাসা, কৃতজ্ঞতা এবং হারানোর বেদনা।
Nadia Farès ১৯৬৮ সালে মরক্কোর Marrakesh-এ জন্মগ্রহণ করেন। পরবর্তীতে তিনি ফ্রান্সে চলে আসেন এবং Nice শহরে বড় হন। শৈশব থেকেই শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রবল, যা পরবর্তীতে তাকে চলচ্চিত্র জগতে নিয়ে আসে।
১৯৯২ সালে ‘My Wife’s Girlfriends’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় অভিষেক ঘটে তার। তবে আন্তর্জাতিকভাবে তার পরিচিতি আসে ২০০০ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত বিখ্যাত পুলিশ থ্রিলার The Crimson Rivers-এ অভিনয়ের মাধ্যমে। এই ছবিতে তার অভিনয় তাকে এক লাফে বিশ্ব চলচ্চিত্র অঙ্গনে পরিচিত করে তোলে। তার অভিনয়ের স্বতঃস্ফূর্ততা, চরিত্রের গভীরে প্রবেশের দক্ষতা এবং পর্দায় উপস্থিতি তাকে সমসাময়িকদের মধ্যে আলাদা করে তুলেছিল।
ক্যারিয়ারের এক পর্যায়ে তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রযোজনায় কাজ করেছেন এবং ফরাসি চলচ্চিত্রের বাইরে গিয়েও নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। তবে ২০০৯ সালে ব্যক্তিগত জীবনের কারণে তিনি অভিনয় থেকে বিরতি নেন। স্বামী ও প্রযোজক স্টিভ চ্যাসম্যানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন তিনি। এই সময়টা ছিল তার জীবনের এক ভিন্ন অধ্যায়, যেখানে তিনি পরিবারকে প্রাধান্য দেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৬ সালে তিনি আবার অভিনয়ে ফেরেন। জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম Netflix-এর সিরিজ Marseille-এ অভিনয়ের মাধ্যমে দর্শকদের সামনে ফিরে আসেন তিনি। তার এই প্রত্যাবর্তন ভক্তদের মধ্যে নতুন করে উচ্ছ্বাস তৈরি করে।
ব্যক্তিগত জীবনে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। ২০২২ সালে স্বামীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পর তিনি আবার ফ্রান্সে ফিরে আসেন এবং সেখানেই স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জীবনের এই পর্যায়ে তিনি কিছুটা নিরিবিলি জীবনযাপন করলেও শিল্পের সঙ্গে তার সম্পর্ক কখনো ছিন্ন হয়নি।
তার মৃত্যুতে ফরাসি চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে এসেছে গভীর শোক। সহকর্মী, ভক্ত এবং সমালোচকরা সবাই তার স্মৃতিচারণ করছেন। অনেকেই বলছেন, তিনি ছিলেন এমন একজন অভিনেত্রী যিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না, বরং তা নিজের মধ্যে ধারণ করতেন। তার প্রতিটি কাজেই ছিল এক ধরনের আন্তরিকতা, যা দর্শকদের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
নাদিয়া ফারেসের জীবন ও কর্ম কেবল একজন অভিনেত্রীর গল্প নয়, বরং এটি এক সংগ্রামী নারীর গল্প, যিনি নিজের প্রতিভা ও পরিশ্রম দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। তার অকাল প্রয়াণে চলচ্চিত্র জগৎ একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হারালো, যার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
তার ভক্তদের কাছে তিনি শুধু একজন শিল্পী নন, বরং এক অনুপ্রেরণার নাম। তার কাজ, তার জীবনদর্শন এবং তার সংগ্রামের গল্প আগামী প্রজন্মকে পথ দেখাবে।
শেষ পর্যন্ত বলা যায়, Nadia Farès চলে গেলেও তার শিল্পকর্ম, তার স্মৃতি এবং তার প্রভাব থেকে যাবে অমলিন হয়ে।