দ্বিতীয় ভূমিকম্প আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় জাপান

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১২ বার
দ্বিতীয় ভূমিকম্প আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় জাপান

প্রকাশ: ২১ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

প্রবল ভূমিকম্পের পর আবারও বড় ধরনের দুর্যোগের আশঙ্কায় উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে Japan। দেশটির উত্তর-পূর্ব উপকূলে ৭.৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানার পর সরকারি সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আরও বড় ভূমিকম্প হওয়ার ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। এই সতর্কতা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে উপকূলীয় অঞ্চলসহ পুরো দেশে।

ভূমিকম্পটি আঘাত হানে রাজধানী Tokyo থেকে প্রায় ৫৩০ কিলোমিটার উত্তরে Iwate উপকূলের সমুদ্র এলাকায়। স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা ৫২ মিনিটে সংঘটিত এই কম্পনের উৎপত্তিস্থল ছিল সমুদ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচে। এর প্রভাব শুধু উপকূলেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং Honshu ও Hokkaido অঞ্চলেও কম্পন অনুভূত হয়। এমনকি টোকিও শহরের বাসিন্দারাও কম্পনের দোলা টের পান।

ভূমিকম্পের পরপরই উপকূলীয় এলাকাগুলোতে জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। সম্ভাব্য সুনামির ঝুঁকি বিবেচনায় মানুষকে দ্রুত নিরাপদ উঁচু স্থানে সরে যেতে বলা হয়। প্রাথমিকভাবে ৩ মিটার পর্যন্ত সুনামি ঢেউয়ের আশঙ্কা করা হলেও বাস্তবে সবচেয়ে বড় ঢেউ ছিল প্রায় ৮০ সেন্টিমিটার। কয়েক ঘণ্টা পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সুনামি সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়, তবে ততক্ষণে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যায়।

সরকারি হিসাবে, সুনামি সতর্কতা জারির পর প্রায় এক লাখ ৭০ হাজার মানুষকে উপকূল ও নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। সতর্কতার মাত্রা ছিল তিন ধাপের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, যা পরিস্থিতির গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। স্থানীয় প্রশাসন ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে সক্ষম হয়, যা বড় ধরনের প্রাণহানি এড়াতে সহায়ক হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

যদিও তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি বা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, তবুও ভূমিকম্পের প্রভাব পুরোপুরি অস্বীকার করা যায় না। কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন চলাচলেও সাময়িক বিঘ্ন ঘটে। তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়ে আসে এবং রাতের মধ্যেই ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু করা হয়।

জাপানের আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করে জানিয়েছে, এই ভূমিকম্পের পরবর্তী সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের মতে, ৮.০ বা তার বেশি মাত্রার আরও একটি শক্তিশালী ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা এখন স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় বেশি। এ ধরনের ভূমিকম্প হলে তা বড় ধরনের সুনামি সৃষ্টি করতে পারে, যা উপকূলীয় অঞ্চলগুলোর জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।

এই সতর্কতা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, জাপানের জনগণের স্মৃতিতে এখনো তাজা রয়েছে ২০১১ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্প ও সুনামির ঘটনা। সেই সময় ৯.০ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করেছিল। ইতিহাসের সেই মর্মান্তিক ঘটনা 2011 Tōhoku earthquake and tsunami নামে পরিচিত, যেখানে ১৮ হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারায় এবং Fukushima Daiichi Nuclear Power Plant-এ মারাত্মক পারমাণবিক দুর্ঘটনা ঘটে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই অভিজ্ঞতাই মানুষকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাসকারী অনেকেই দ্রুত নিজেদের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। অনেক জায়গায় লাউডস্পিকারের মাধ্যমে মানুষকে সতর্কবার্তা দেওয়া হয় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করা হয়।

Hokkaido অঞ্চলে বসবাসরত এক প্রবাসী জানান, ভূমিকম্পের সতর্কতা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সবাই দ্রুত নিচে নেমে আসে এবং নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। যদিও এবার কম্পনের তীব্রতা তুলনামূলকভাবে কম ছিল, তবুও সবাই আগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী Sanae Takaichi জনগণকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, সুনামির ঢেউ একাধিকবার আঘাত হানতে পারে, তাই সরকারি নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ স্থান ত্যাগ না করার জন্য সবাইকে অনুরোধ করা হচ্ছে। তার এই বার্তা মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

জাপান ভৌগোলিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ একটি অঞ্চলে অবস্থিত। এটি প্রশান্ত মহাসাগরের ‘রিং অব ফায়ার’-এর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। প্রতি বছর দেশটিতে প্রায় দেড় হাজার ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয় এবং বিশ্বে ৬.০ বা তার বেশি মাত্রার প্রায় ১০ শতাংশ ভূমিকম্পই জাপানে ঘটে।

এই বাস্তবতার কারণে জাপান সরকার দীর্ঘদিন ধরেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অত্যন্ত দক্ষতা অর্জন করেছে। ভূমিকম্প শনাক্তকরণ, আগাম সতর্কতা প্রদান, দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেশটি বিশ্বের অন্যতম অগ্রণী।

তবে সাম্প্রতিক এই ভূমিকম্প ও পরবর্তী সতর্কতা আবারও মনে করিয়ে দিল, প্রকৃতির শক্তির সামনে মানুষ কতটা অসহায়। প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ও প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও বড় ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জাপানজুড়ে এক ধরনের সতর্কতা ও প্রস্তুতির আবহ বিরাজ করছে। মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তাদের মধ্যে একটি চাপা উদ্বেগ কাজ করছে। প্রশাসনও পরিস্থিতির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পটি বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি না ঘটালেও এটি একটি সম্ভাব্য বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন সবার দৃষ্টি আগামী দিনগুলোর দিকে, যেখানে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, সেটিই নির্ধারণ করবে জাপানের জন্য আসন্ন সময় কতটা চ্যালেঞ্জিং হতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত