হাম-উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জনের মৃত্যু

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬
  • ১৪ বার
হাম-উপসর্গে ২৪ ঘণ্টায় ১৭ জনের মৃত্যু

প্রকাশ: ০৪ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশজুড়ে হাম ও হাম উপসর্গজনিত সংক্রমণ পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত একদিনে সন্দেহজনক ও নিশ্চিত মিলিয়ে হাম-উপসর্গে মোট ১৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন রোগী শনাক্ত ও হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা বাড়ায় স্বাস্থ্য খাতে চাপও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম থেকে সোমবার প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩০২ জনে। এই সময়ের মধ্যে নিশ্চিতভাবে শনাক্ত হাম রোগীর সংখ্যা ১৫৪ জন। এ ছাড়া ১৫ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক রোগীর সংখ্যা পৌঁছেছে ৪১ হাজার ৭৯৩ জনে এবং নিশ্চিত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৪৬৭ জনে।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাম সন্দেহে আরও ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। সব মিলিয়ে ১৫ মার্চ থেকে ৪ মে পর্যন্ত সময়কালে সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫৯ জনে এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৫২ জনের।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সময়ে আক্রান্ত রোগীদের বড় একটি অংশ শিশু। বিশেষ করে পাঁচ বছরের নিচের শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ও জটিলতার হার তুলনামূলকভাবে বেশি বলে হাসপাতাল সূত্রগুলো জানিয়েছে। দীর্ঘ সময় জ্বর, সর্দি-কাশি, শরীরে র‍্যাশ এবং শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ নিয়ে অনেক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, যাদের একটি অংশ পরবর্তীতে জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে।

গত কয়েক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বাড়তে শুরু করেছে। রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর শিশু হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত শয্যা ব্যবস্থাপনা করতে হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, একসঙ্গে বিপুল সংখ্যক রোগী আসায় চিকিৎসা ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে অক্সিজেন সাপোর্ট ও আইসিইউ সেবার ক্ষেত্রে।

চিকিৎসকরা বলছেন, হামের বিস্তার মূলত টিকাদান কাভারেজের ঘাটতি এবং মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবহাওয়ার তারতম্য, বিশেষ করে গরম ও বৃষ্টির ওঠানামা শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে দুর্বল করছে, যা সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার একটি বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। একটি সংক্রমিত ব্যক্তি সহজেই আশপাশের অনেককে আক্রান্ত করতে পারে, যদি তারা আগে টিকা না নিয়ে থাকে বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়। ফলে পরিবার ও শিশুদের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সন্দেহজনক রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে আলাদা ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। হাসপাতালগুলোকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যেন জ্বর ও র‍্যাশজনিত রোগীদের আলাদা করে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়।

এদিকে চিকিৎসকদের আরেকটি উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক অভিভাবক এখনো শিশুদের নিয়মিত টিকাদান সম্পন্ন করেননি। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী আরও বড় হয়ে উঠছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়, বরং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত জরুরি।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত কয়েকদিনে ভর্তি হওয়া রোগীদের একটি বড় অংশই গ্রামাঞ্চল ও নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু। অনেক ক্ষেত্রে দেরিতে হাসপাতালে আসায় রোগীর অবস্থা জটিল হয়ে পড়ছে, যা মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে আগামী কয়েক সপ্তাহে সংক্রমণের হার আরও বাড়তে পারে। বিশেষ করে স্কুল ও শিশুদের ঘনবসতিপূর্ণ পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মানা না হলে সংক্রমণ আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী মোতায়েনের প্রস্তুতি রয়েছে। একই সঙ্গে ওষুধ ও টিকা সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলো টিকাদান নিশ্চিত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে দ্রুত আলাদা করা। পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা দূর করা এবং শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোও দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেশে চলমান এই পরিস্থিতিতে অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়লেও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ আশাবাদী যে দ্রুত পদক্ষেপ ও টিকাদান কার্যক্রম জোরদার হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত