ডলারের বাজারে কৌশলগত উপস্থিতি: বেশি দামে আরও ১০ মিলিয়ন ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৫ জুলাই, ২০২৫
  • ৪০ বার
ডলারের বাজারে কৌশলগত উপস্থিতি: বেশি দামে আরও ১০ মিলিয়ন ডলার কিনল বাংলাদেশ ব্যাংক

প্রকাশ: ২৫ জুলাই’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন

বাংলাদেশের মুদ্রাবাজারে ডলারের দামের গতিপ্রকৃতি নতুন মোড় নিচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের বাজার ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণার পরও বাংলাদেশ ব্যাংক কৌশলগতভাবে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে আবারও হস্তক্ষেপ করেছে। বাজারে একটি স্পষ্ট ঊর্ধ্বমুখী সংকেত দিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১০ মিলিয়ন বা এক কোটি মার্কিন ডলার কিনেছে। এই ডলার কেনার মাধ্যমে ব্যাংক মূলত বাজারে ডলারের মূল্য বাড়ানোর এক ধরনের বার্তা দিয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আগের ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ—‘প্রয়োজন হলে ডলার কেনা হবে, আবার প্রয়োজন হলে বিক্রিও।’

২৩ জুলাই আয়োজিত নিলামে বাংলাদেশ ব্যাংক ডলারের কাট-অফ রেট নির্ধারণ করেছে ১২১ টাকা ৯৫ পয়সা, যা আগের নিলামের তুলনায় ৪৫ পয়সা বেশি। মাত্র আট দিনের ব্যবধানে এই মূল্যবৃদ্ধি নীতিগতভাবে বাজারকে একটি ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানান, বিভিন্ন ব্যাংকের প্রস্তাবিত দর মূল্যায়নের ভিত্তিতে এই রেট নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এক কোটি ডলার কিনেছে। তিনি এটিকে স্বাভাবিক নীতিগত প্রক্রিয়া বলে অভিহিত করেছেন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই পদক্ষেপ শুধু বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর সঙ্গে চুক্তির আওতায় বাজারভিত্তিক বিনিময় হার বাস্তবায়নের পথেও একধাপ অগ্রগতি। আইএমএফের শর্ত অনুযায়ী, মে মাস থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক সরাসরি নির্দিষ্ট রেটে ডলার কেনা-বেচা বন্ধ করে দিয়েছে। এখন বাজারেই মূল্য নির্ধারিত হচ্ছে, আর বাংলাদেশ ব্যাংক সেখানে নিলামের মাধ্যমে অংশ নিচ্ছে।

একের পর এক ডলার কেনার ঘটনায় চলমান নিলাম প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতিমধ্যে মোট ৪৯৬ মিলিয়ন ডলার কিনে ফেলেছে। এর মধ্যে ১৩ ও ১৫ জুলাইয়ের নিলামে যথাক্রমে ১২১.৫০ টাকা দরে ১৭৩ এবং ৩১৩ মিলিয়ন ডলার কেনা হয়েছিল। এবারকার নিলামে অংশগ্রহণকারী ব্যাংকের সংখ্যা কম ছিল বলে জানা গেছে। একাধিক ব্যাংক ধারণা করছে, ডলারের দাম আরও বাড়বে, তাই তারা অপেক্ষার কৌশল নিয়েছে। অনেক ব্যাংক চড়া দরের কারণেও অংশ নেয়নি।

একটি শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, এবার অনেক ব্যাংক আগ্রহ দেখায়নি। কারণ তারা মনে করছে সামনে দাম আরও বাড়তে পারে। এতেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে বাজারে ভবিষ্যৎ ডলারের দামের বিষয়ে ব্যাংকগুলোর প্রত্যাশা কেমন। ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মারুফ জানান, চলতি মাসেই বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রায় ৫০ কোটি ডলার বিক্রি করেছে, তাই ব্যাংকগুলোর হাতে বাড়তি ডলার নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ ব্যাংক যা পেয়েছে, তা মূলত উদ্বৃত্ত ডলারের অংশ।

এদিকে, মুদ্রাবাজারে সামগ্রিক চাপ বাড়ার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে আমদানি খাতে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী মনে করেন, এ কারণেই সাম্প্রতিক সময়ে ডলারের বাজার কিছুটা টাইট হয়ে গেছে। তবে তিনি আশাবাদী, আগামী সপ্তাহে রেমিট্যান্স প্রবাহ বা রপ্তানি আয় বাড়লে ডলার সরবরাহ বাড়বে এবং পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে। তবে মূল্যবৃদ্ধি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সেদিকেও দৃষ্টি রাখার কথা বলেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২৩ জুলাই স্পট মার্কেটে ডলারের বিনিময় হার ছিল ১২১.৯৪ টাকা। আন্তঃব্যাংক বাজারে লেনদেন হয়েছে ১২১.৬০ থেকে ১২২.০২ টাকার মধ্যে। একটি শীর্ষ ব্যাংকের কর্মকর্তা বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘আপওয়ার্ড সিগন্যাল’-এর ফলে বাজারে প্রত্যাশা বেড়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব আরও দাম বৃদ্ধিতে পরিণত হতে পারে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক নীতিনির্ধারক বলেন, নতুন এই কৌশল বাজারকে একদিকে স্বাধীন রাখছে, অন্যদিকে নীতিগত হস্তক্ষেপের সুযোগও বজায় রাখছে। ফলে ভবিষ্যতে মুদ্রাবাজার আরও স্বচ্ছ ও স্থিতিশীল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

ডলারের বাজার এখন শুধু চাহিদা-জোগানের খেলা নয়, বরং কৌশল, প্রত্যাশা এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শর্ত পূরণে এক সম্মিলিত নীতির লড়াই। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ একদিক থেকে নতুন বাজার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সক্ষমতার প্রমাণ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত