নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বৃদ্ধির চাপ, বিপাকে মধ্যবিত্ত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৬
  • ১৭ বার
নিত্যপণ্যের বাজারে দাম বাড়ায় চাপে মধ্যবিত্তরা। খাদ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে জীবনযাত্রায় তৈরি হয়েছে নতুন সংকট ও উদ্বেগ।

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের নিত্যপণ্যের বাজারে আবারও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। একদিকে ভোক্তার আয় কমে যাওয়া, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে যুদ্ধজনিত প্রভাব ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে চাপের মুখে পড়েছে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে জ্বালানি, সবজিসহ প্রায় সব ধরনের নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ছে বলে জানিয়েছেন ভোক্তারা।

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক উত্তেজনা ও সরবরাহ ব্যবস্থার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে ডলারের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পণ্যের খরচ আরও বেড়েছে। পরিবহন খাতে জ্বালানি সংকট এবং ট্রাক ভাড়ার অতিরিক্ত চাপও বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, মার্চ মাসে মূল্যস্ফীতির হার কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে খাদ্যপণ্যের দাম এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং মজুরি বৃদ্ধির হার ৮ দশমিক ০৯ শতাংশ, যা বাস্তবে ভোক্তার আয়ের তুলনায় কম। অর্থাৎ মানুষের আয় বৃদ্ধির চেয়ে ব্যয় বৃদ্ধির হার বেশি, ফলে জীবনযাত্রার চাপ বাড়ছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক পরিবার এখন সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ নিয়ে জীবন চালাতে বাধ্য হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি পুষ্টিহীনতা, শিক্ষা ব্যয় সংকোচন এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিপ্রতি ২১০ টাকা, যা এক মাস আগে ছিল ১৮০ টাকা। সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৪৩০ থেকে ৪৪০ টাকায়, যা আগের তুলনায় প্রায় শতাধিক টাকা বেশি। গরুর মাংসের দামও কেজিপ্রতি বেড়ে ৮০০ টাকায় পৌঁছেছে।

ভোজ্যতেলের বাজারে দেখা দিয়েছে নতুন সংকট। বোতলজাত সয়াবিন তেল অনেক দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। খোলা সয়াবিন তেল বিক্রি হচ্ছে ২১০ থেকে ২২০ টাকায়, যা এক মাস আগে ছিল ১৮৫ টাকা। চিনির দামও বেড়ে কেজিপ্রতি ১০৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

সবজি বাজারেও একই চিত্র। প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিপ্রতি ৮০ টাকার ওপরে। বেগুন, পটোল, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়শসহ বেশিরভাগ সবজি আগের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি এই দামের প্রধান কারণ।

মাছের বাজারেও চাপ অব্যাহত রয়েছে। প্রায় সব ধরনের মাছ ২০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। চিংড়ি, কই, শিং, রুই, তেলাপিয়া—সবকিছুর দাম বেড়ে মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

অর্থনীতিবিদ ও সাবেক বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আয় বাড়ার তুলনায় ব্যয় বৃদ্ধি বেশি হওয়ায় মানুষ এখন বাধ্য হয়ে সঞ্চয় ভেঙে বা ঋণ নিয়ে জীবন চালাচ্ছে। দারিদ্র্যসীমার নিচে থাকা মানুষদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।

পরিবহন খাতে জ্বালানি সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ট্রাক ভাড়া আগের তুলনায় ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা। এতে কৃষিপণ্যসহ সব ধরনের পণ্যের সরবরাহ খরচ বেড়ে গেছে।

রান্নার গ্যাসের বাজারেও বড় ধাক্কা লেগেছে। এলপিজি সিলিন্ডারের দাম এক মাসে প্রায় ৩৮৭ টাকা বেড়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকায় পৌঁছেছে। তবে অনেক জায়গায় ২ হাজার টাকার নিচে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলো বলছে, বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে।

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) মতে, বাজারে কঠোর নজরদারি না থাকলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সরকার প্রতিদিন অভিযান চালালেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসছে না।

সব মিলিয়ে নিত্যপণ্যের বাজারের এই অস্থিরতা সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো এখন ব্যয় সংকোচন করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত