প্রকাশ: ২৫শে জুলাই ২০২৫ । নিজস্ব সংবাদদাতা।একটি বাংলাদেশ অনলাইন
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নাটকীয় মোড় নেওয়া ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পর, সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক দল—জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)—এই জুলাই মাসে ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শাহজালের পুণ্যভূমি সিলেটে পদার্পণ করেছে। গণজাগরণ ও নতুন রাজনৈতিক চেতনার বার্তা নিয়ে এনসিপির এই পদযাত্রা শুধু একটি সংগঠনের রাজনৈতিক উপস্থিতির বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এক বছর আগে পাল্টে দেওয়া ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জনতার প্রত্যাশা ও সম্পৃক্ততার বহিঃপ্রকাশ বলেও অনেকেই মনে করছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনীতি এক চরম মোড় নেয়। দেশের ইতিহাসে এক স্মরণীয় গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগে বাধ্য হন। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন ছাত্রনেতা নাহিদ ইসলামসহ কয়েকজন তরুণ সংগঠক। এই আন্দোলনের সাফল্যের পর অন্তর্বর্তী সরকারে উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন নাহিদ ইসলাম, যার নেতৃত্বে পরবর্তীতে গঠিত হয় জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
এক বছর পর সেই ‘জুলাই আন্দোলন’-এর স্মৃতি আর নতুন রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে সিলেট, সুনামগঞ্জ এবং মৌলভীবাজারে এনসিপি আয়োজন করেছে বিশাল জনসমাবেশ এবং পদযাত্রা কর্মসূচি। শুক্রবার বিকেল ৫টায় সিলেট শহরে চৌহাট্টাস্থ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে পদযাত্রা শুরু হয়। এই পদযাত্রা নগরীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বক্তব্য পর্বের মাধ্যমে শেষ হবে।
এনসিপির তরফে জানানো হয়, এই কর্মসূচিতে প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীর উপস্থিতি প্রত্যাশা করা হয়েছে। উপস্থিত থাকবেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব—আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, সদস্যসচিব আখতার হোসেন, দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন ও আরিফুল ইসলাম আদীব, যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও নাহিদা সারওয়ার নিভা এবং সিনিয়র মুখ্য সমন্বয়ক আব্দুল হান্নান মাসউদ। কেন্দ্রীয় নেতাদের পাশাপাশি স্থানীয় নেতৃবৃন্দের উপস্থিতিও কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে জনমনে উৎসাহ ও উত্তেজনা তৈরি করেছে।
শহরের বিভিন্ন প্রান্তে এনসিপির আগমন ঘিরে ব্যানার, ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে রাস্তাঘাট। তবে এর কিছু ছেঁড়ে ফেলা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানান প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি জনমনে এক ধরনের উদ্বেগেরও জন্ম দিয়েছে।
এনসিপির একাংশ ইতোমধ্যেই বৃহস্পতিবার রাতে সুনামগঞ্জে পৌঁছেছেন। সার্কিট হাউজে রাত্রিযাপন শেষে শুক্রবার জুমার নামাজ আদায় করে শহরের ডিএস রোড এলাকা থেকে শুরু হয় সেখানকার পদযাত্রা, যার গন্তব্য ট্রাফিক পয়েন্টে একটি পথসভা। স্থানীয় প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ হাজার সমর্থক সেখানে জমায়েত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় শহরজুড়ে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
সুনামগঞ্জে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ রয়েছে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) জাকির হোসেন জানান, পুলিশের পোশাকধারী ও সাদা পোশাকের সদস্যরা শহরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নিয়োজিত রয়েছেন।
এদিকে শনিবার মৌলভীবাজারে অনুষ্ঠিত হবে এনসিপির আরেকটি বড় পদযাত্রা ও পথসভা। সকাল ১১টায় শহরের বেরিরপাড় পয়েন্ট থেকে শুরু হবে পদযাত্রা, যেখানে উপস্থিত থাকবেন জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী শীর্ষ নেতৃবৃন্দসহ জেলা ও উপজেলার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। চৌমোহনা চত্বরে দুপুর ২টায় জনতার সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে শেষ হবে কর্মসূচি।
পদযাত্রার পূর্বে মৌলভীবাজারের একটি সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির জেলা শাখার প্রধান সমন্বয়কারী ফাহাদ আলম জানান, সুশৃঙ্খল ও সফল কর্মসূচি বাস্তবায়নে প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মৌলভীবাজারেও এনসিপির ব্যানার-ফেস্টুন লাগানো এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উত্তেজনা ও কৌতূহল লক্ষ করা গেছে।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পথিকৃৎ, ফ্যাসিস্ট আমলে কারাবন্দি থেকে উঠে আসা নেতাদের এখনকার পদচারণা রাজনীতিতে নতুন এক যুগের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলেই বিশ্লেষকরা মনে করছেন। এনসিপির নেতৃত্বাধীন এই ধারাবাহিক পদযাত্রা কতটুকু গণআশা পূরণে সক্ষম হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে শাহজালের শহর সিলেট থেকে শুরু হওয়া এই যাত্রা দেশের রাজনীতিতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনাস্বরূপ বলেও অনেকেই মনে করছেন।
একটি বাংলাদেশ অনলাইন