চাপের মুখেও সরে যাচ্ছেন না স্টারমার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১১ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
চাপের মুখেও সরে যাচ্ছেন না স্টারমার

প্রকাশ: ১১ মে  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ব্রিটিশ রাজনীতিতে আবারও অস্থিরতার আভাস দেখা দিয়েছে। স্থানীয় নির্বাচনে ভরাডুবির পর প্রবল চাপে পড়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ক্ষমতাসীন লেবার পার্টির সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফল শুধু রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরই বিস্মিত করেনি, বরং দলটির ভেতরেও সৃষ্টি করেছে তীব্র অসন্তোষ। এমন পরিস্থিতিতে নিজ দলের কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতাই স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে সব চাপ ও বিতর্কের মাঝেও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী—তিনি এখনই সরে যাচ্ছেন না। বরং তিনি তার সরকারকে একটি “১০ বছরের প্রকল্প” হিসেবে দেখছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

গত তিন দশকের মধ্যে এবারই স্থানীয় নির্বাচনে সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে লেবার পার্টি। বহু গুরুত্বপূর্ণ কাউন্সিল ও স্থানীয় প্রশাসনিক আসনে দলটি বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই দলটির ভেতরে ক্ষোভ বাড়তে থাকে। অনেক সংসদ সদস্য মনে করছেন, জনগণের আস্থা ধরে রাখতে স্টারমার ব্যর্থ হয়েছেন এবং তার নেতৃত্বে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দল আরও বিপদে পড়তে পারে।

বিশেষ করে সাবেক মন্ত্রী ক্যাথরিন ওয়েস্টের মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় আলোড়ন তুলেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যদি দ্রুত নেতৃত্ব পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তাহলে তিনি নতুন নেতা নির্বাচনের দাবিতে ভোটাভুটির উদ্যোগ নেবেন। ব্রিটিশ আইন অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন দলের ৮১ জন সংসদ সদস্য লিখিতভাবে অনাস্থা জানালে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্ব আনুষ্ঠানিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ জন এমপি প্রকাশ্যে স্টারমারের সমালোচনা শুরু করেছেন, যা লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ সংকটকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

তবে এমন উত্তপ্ত রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যেও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছেন স্টারমার। রোববার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “২০২৪ সালের জুলাই মাসে জনগণ যে দায়িত্ব আমাকে দিয়েছে, আমি তা থেকে সরে যাব না। আমি দেশকে বিশৃঙ্খলার মধ্যে ঠেলে দেব না।” তার এই বক্তব্যকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা একটি স্পষ্ট বার্তা হিসেবে দেখছেন—স্টারমার কেবল বর্তমান সংকট মোকাবিলা করতেই চান না, বরং আগামী সাধারণ নির্বাচনেও দলকে নেতৃত্ব দিতে প্রস্তুত।

স্টারমারের এই অবস্থান তার রাজনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি শুরু থেকেই বলে আসছেন, ব্রিটেনের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যখাত, শিক্ষা ও অভিবাসন ব্যবস্থার মতো বড় সমস্যাগুলোর সমাধান রাতারাতি সম্ভব নয়। তার মতে, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ধারাবাহিক নীতির মাধ্যমেই কেবল দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। সেই কারণেই তিনি তার সরকারকে “১০ বছরের প্রকল্প” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তবে বিরোধীরা বলছে, এই বক্তব্য বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খায় না। কনজারভেটিভ পার্টির নেতারা দাবি করছেন, স্থানীয় নির্বাচনের ফল প্রমাণ করে জনগণ ইতোমধ্যেই স্টারমারের নেতৃত্বে আস্থা হারাতে শুরু করেছে। তাদের মতে, সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপ, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জনসেবার অবনতিতে হতাশ। ফলে সরকারবিরোধী মনোভাব দ্রুত বাড়ছে।

অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, স্থানীয় নির্বাচন সবসময় জাতীয় নির্বাচনের প্রতিফলন নয়। অনেক সময় স্থানীয় ইস্যু, আঞ্চলিক নেতৃত্ব এবং নির্দিষ্ট কাউন্সিলের কার্যক্রমও ভোটের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখে। তাই এখনই স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।

তবে এটিও সত্য, ব্রিটিশ রাজনীতিতে নেতৃত্ব সংকট নতুন কিছু নয়। গত এক দশকে দেশটি একের পর এক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ব্রেক্সিট বিতর্ক, অর্থনৈতিক সংকট, কোভিড-পরবর্তী পরিস্থিতি এবং দলীয় কোন্দলের কারণে যুক্তরাজ্যে প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তন যেন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। স্টারমার যদি শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, তাহলে গত দশ বছরে ব্রিটেন তাদের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী পাবে।

এই প্রেক্ষাপটে স্টারমারের সোমবারের ভাষণকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা এখনও প্রকাশ্যে তার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছেন। শিক্ষামন্ত্রী ব্রিজেট ফিলিপসন জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর সামনে একটি “নতুন দিকনির্দেশনা” তুলে ধরবেন। ধারণা করা হচ্ছে, সেই ভাষণে অর্থনীতি, জনসেবা এবং রাজনৈতিক সংস্কার নিয়ে বড় ধরনের পরিকল্পনা ঘোষণা করতে পারেন স্টারমার।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ভাষণই নির্ধারণ করতে পারে তার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ। যদি তিনি জনগণ ও দলের ভেতরের অসন্তুষ্ট অংশকে আশ্বস্ত করতে পারেন, তাহলে হয়তো আপাতত নেতৃত্ব সংকট কাটিয়ে উঠবেন। কিন্তু ব্যর্থ হলে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ আরও তীব্র হতে পারে।

স্টারমারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন দলীয় ঐক্য ধরে রাখা। কারণ ব্রিটিশ রাজনীতিতে দলীয় বিভক্তি প্রায়ই সরকারের পতনের কারণ হয়েছে। নিজের দলের সমর্থন হারালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই তিনি একদিকে যেমন জনসমর্থন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছেন, অন্যদিকে দলীয় এমপিদেরও পাশে রাখার কৌশল নিচ্ছেন।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, স্টারমারের ব্যক্তিত্ব তুলনামূলকভাবে স্থির ও সংযত হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকে আরও দৃঢ় নেতৃত্বের পরিচয় দিতে হবে। কারণ ব্রিটিশ জনগণ এখন এমন একজন নেতাকে খুঁজছে, যিনি শুধু সংকটের কথা বলবেন না, বরং কার্যকর সমাধানের পথও দেখাতে পারবেন।

তবে স্টারমারের সমর্থকেরা বলছেন, তিনি এখনো দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত নেতৃত্ব। তাদের মতে, স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তিনি যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার কথা বলছেন, সেটিই ভবিষ্যতে ব্রিটেনকে স্থিতিশীলতা দিতে পারে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে ব্রিটেনের জনগণও অপেক্ষা করছে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য। স্টারমারের নেতৃত্ব টিকে থাকবে নাকি লেবার পার্টিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে—সেই প্রশ্নের উত্তর হয়তো খুব দ্রুতই মিলতে যাচ্ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত