সম্পদ কর ফিরছে, বাড়তে পারে রাজস্ব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৩ মে, ২০২৬
  • ১১ বার
১ শতাংশ সম্পদ কর ফিরছে, বাড়তে পারে ৫ হাজার কোটি রাজস্ব

প্রকাশ: ১৩ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশের ক্রমবর্ধমান আয় ও সম্পদ বৈষম্য কমানো, একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে নতুন গতি আনতে বহু বছর পর আবারও সম্পদ কর চালুর পথে হাঁটছে সরকার। আসন্ন জাতীয় বাজেটে সর্বোচ্চ ১ শতাংশ পর্যন্ত সম্পদ কর আরোপের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা চলছে সরকারের উচ্চপর্যায়ে। প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে বর্তমান সম্পদ সারচার্জ ব্যবস্থা বাতিল করে সরাসরি করদাতার নিট সম্পদের ওপর কর আরোপ করা হবে। সরকারের আশা, নতুন এই ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে।

অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, বাজেট প্রণয়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে সম্পদ কর নিয়ে আলোচনা এখন বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। সোমবার অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং এনবিআর কর্মকর্তাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শুধু রাজস্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নয়; বরং ধনী ও দরিদ্রের মধ্যকার বৈষম্য কমাতে পুনর্বণ্টনমূলক করনীতির অংশ হিসেবেও বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে সম্পদের ওপর সরাসরি কর নেই। বিদ্যমান ব্যবস্থায় করদাতার আয়করের ওপর নির্ভর করে সম্পদ সারচার্জ আরোপ করা হয়। ফলে বিপুল সম্পদের মালিক হলেও যদি কারও করযোগ্য আয় কম দেখানো হয়, তাহলে তিনি তুলনামূলক কম সারচার্জ দিয়ে থাকেন। এনবিআর কর্মকর্তাদের মতে, এ কারণেই বর্তমান ব্যবস্থা কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব দিতে পারছে না।

নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, করদাতাদের ঘোষিত নিট সম্পদের ওপর সরাসরি কর আরোপ করা হবে। প্রথমদিকে কর নির্ধারণ করা হতে পারে আয়কর রিটার্নে ঘোষিত সম্পদের ভিত্তিতে। কারণ দেশের বিদ্যমান কাঠামোয় সম্পদের প্রকৃত বাজারমূল্য নির্ধারণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। তবে ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি চালুর পরিকল্পনাও সরকারের রয়েছে বলে জানা গেছে।

প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত নিট সম্পদ করমুক্ত থাকতে পারে। এরপর ৪ কোটি থেকে ৬ কোটি টাকার সম্পদের ওপর ০.২৫ শতাংশ, পরবর্তী ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৫০ শতাংশ, এরপরের ৫ কোটি টাকার ওপর ০.৭৫ শতাংশ এবং ১৬ কোটি টাকার বেশি সম্পদের ওপর ১ শতাংশ পর্যন্ত কর আরোপের আলোচনা চলছে। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বাজেট ঘোষণার আগে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সরকার এমন কোনো করনীতি নিতে চায় না, যাতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হয়। বরং যাদের হাতে বিপুল সম্পদ জমা হয়েছে, তাদের কাছ থেকে বেশি অবদান নিশ্চিত করার দিকেই জোর দেওয়া হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এবং রাজস্ব ঘাটতির প্রেক্ষাপটে সরকার নতুন আয়ের উৎস খুঁজছে। সেই জায়গা থেকেই সম্পদ করের বিষয়টি সামনে এসেছে।

বাংলাদেশে প্রথম সম্পদ কর চালু হয়েছিল ১৯৬৩ সালে ‘ওয়েল্থ ট্যাক্স অ্যাক্ট’-এর মাধ্যমে। কিন্তু সম্পদের মূল্যায়ন জটিলতা, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা এবং দ্বৈত কর আরোপের অভিযোগের কারণে ১৯৯৯ সালে আইনটি বাতিল করা হয়। এরপর থেকে সম্পদ কর আর ফিরিয়ে আনা হয়নি। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতিবিদেরা বৈষম্য কমাতে এ ধরনের করব্যবস্থা পুনর্বিবেচনার পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন।

অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশে সম্পদের বৈষম্য দ্রুত বাড়ছে। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ উদ্বেগজনক। তার মতে, এই পরিস্থিতিতে উচ্চ সম্পদের ওপর কর আরোপ করা যৌক্তিক এবং সময়োপযোগী।

তিনি বলেন, বিশ্বের বহু দেশ আয়ভিত্তিক সারচার্জের পরিবর্তে সরাসরি সম্পদ কর আরোপ করে থাকে। এতে রাজস্ব আদায় বাড়ে এবং সম্পদের সুষম বণ্টনে সহায়তা করে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সম্পদের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ ও কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো না গেলে বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে সাবেক এনবিআর সদস্য অপূর্ব কান্তি দাস বিষয়টিকে সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, নতুন করব্যবস্থা কার্যকর হলে নিয়মিত করদাতারাই সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়তে পারেন। যারা সম্পদ গোপন করেন বা কর ফাঁকি দেন, তাদের শনাক্ত করতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া কঠিন হবে।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় এমন মানুষও আছেন যাদের সম্পদের পরিমাণ বেশি, কিন্তু নগদ আয় কম। তাদের ক্ষেত্রে বছরে বড় অঙ্কের সম্পদ কর দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে। এতে সম্পদ বিক্রি করে কর পরিশোধের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি সম্পদের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে বিরোধ ও মামলা বাড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

তবে এনবিআর কর্মকর্তারা মনে করছেন, প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যভাণ্ডার, ব্যাংকিং তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্পদ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা গেলে করদাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। বর্তমানে মাত্র ১১ হাজারের কিছু বেশি করদাতা সম্পদ সারচার্জের আওতায় রয়েছেন। নতুন ব্যবস্থায় এই সংখ্যা কয়েকগুণ বাড়তে পারে বলে আশা করছে সরকার।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় কম। উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য সরকারের বাড়তি রাজস্ব প্রয়োজন। সে কারণে উচ্চ সম্পদের ওপর কর আরোপ আন্তর্জাতিকভাবেও একটি স্বীকৃত পদ্ধতি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পদ কর বাস্তবায়ন কেবল অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ দীর্ঘদিন ধরে দেশে ধনী-গরিব বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এমন অবস্থায় সরকারের এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেট উপস্থাপনের কথা রয়েছে। সেই বাজেটে সম্পদ করের বিষয়টি চূড়ান্তভাবে অন্তর্ভুক্ত হলে প্রায় তিন দশক পর বাংলাদেশে আবারও সরাসরি সম্পদ করের যুগ শুরু হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত