হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সমন্বিত রোডম্যাপ দিলেন তাসনিম জারা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬
  • ৫ বার
হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ে সমন্বিত রোডম্যাপ দিলেন তাসনিম জারা

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দেশে চলমান হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপের প্রস্তাব তুলে ধরেছেন চিকিৎসক, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রাজনীতিবিদ ডা. তাসনিম জারা। শুক্রবার (১৫ মে) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি হামের সংক্রমণ, নিয়ন্ত্রণ কৌশল এবং জরুরি করণীয় বিষয়ে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেন।

ডা. তাসনিম জারা তার পোস্টে বলেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি রোগ, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা রাখে। তিনি সতর্ক করে বলেন, কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তার মতে, হামের সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে শুধু চিকিৎসা নয়, বরং সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জরুরি।

তিনি ব্যাখ্যা করেন, হাম ভাইরাস বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় এবং একজন আক্রান্ত ব্যক্তি গড়ে বহু মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। এমনকি আক্রান্ত ব্যক্তি কোনো স্থানে যাওয়ার পর ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেই পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ থাকতে পারে। এই কারণে রোগটি নিয়ন্ত্রণে উচ্চমাত্রার টিকাদান কাভারেজ অপরিহার্য বলে তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের জন্য অন্তত ৯৫ শতাংশ টিকাদান নিশ্চিত করতে হবে, নইলে সংক্রমণের ঝুঁকি থেকে যায়।

তবে জাতীয় পর্যায়ে উচ্চ টিকাদান হার থাকলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভিন্নতা থাকায় প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন। শহরের বস্তি, প্রত্যন্ত অঞ্চল কিংবা পাহাড়ি এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি থাকলে সেসব জায়গায় দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। এই “ফাঁকা পকেট” চিহ্নিত না করলে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায় বলে তিনি সতর্ক করেন।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি একটি জাতীয় হটলাইন বা কল সেন্টার ব্যবস্থার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এই ব্যবস্থার মাধ্যমে রোগ শনাক্তকরণ, যোগাযোগ অনুসন্ধান, তথ্য সংগ্রহ এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার সমন্বয় একসঙ্গে করা সম্ভব হবে। সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করে চিকিৎসকেরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং রোগীদের নির্দিষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্রে পাঠানো যাবে।

তিনি আরও বলেন, একটি কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে দেশব্যাপী হামের সংক্রমণ পরিস্থিতি রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে। কোন এলাকায় সংক্রমণ বাড়ছে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সেখানে টিকা কার্যক্রম জোরদার করা যাবে। একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।

ডা. তাসনিম জারা তার প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার উদাহরণও তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যের এনএইচএস ১১১ সেবা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের হেল্পলাইন ব্যবস্থা এবং ইবোলা নিয়ন্ত্রণে পশ্চিম আফ্রিকার হটলাইন সার্ভেইল্যান্স সিস্টেমকে সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।

তার মতে, হামের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর কৌশল হলো “রিং ভ্যাকসিনেশন” বা সংক্রমণ কেন্দ্র ঘিরে টিকাদান। কোনো এলাকায় রোগ শনাক্ত হলে আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা সবাইকে দ্রুত টিকার আওতায় আনার মাধ্যমে সংক্রমণ চক্র ভেঙে দেওয়া সম্ভব। তবে টিকা নেওয়ার পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে সময় লাগে, তাই টিকাদানের পাশাপাশি সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে বলে তিনি জানান।

তিনি হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, আক্রান্ত শিশুদের এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘোরাফেরা করানো শুধু চিকিৎসা বিলম্ব করে না, বরং নতুন করে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করে। যেহেতু হাম বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায়, তাই হাসপাতাল পরিবেশও সংক্রমণের কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

এই সমস্যা সমাধানে তিনি প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট চিকিৎসা কেন্দ্র নির্ধারণের প্রস্তাব দেন, যেখানে সন্দেহভাজন রোগীদের আলাদা করে চিকিৎসা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ন্যাশনাল বেড অ্যাভেইলেবিলিটি ড্যাশবোর্ড চালুর মাধ্যমে রোগীদের দ্রুত উপযুক্ত হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থা করা যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তিনি আরও বলেন, শিশুদের আইসিইউ সংকট একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই সংকট মোকাবিলায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে বিভাগীয় পর্যায়ে পেডিয়াট্রিক আইসিইউ সুবিধা বাড়ানো জরুরি বলে তিনি মত দেন।

চিকিৎসা ব্যয়ের বিষয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, উচ্চ আউট-অফ-পকেট ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারে না, যা রোগের জটিলতা বাড়িয়ে দেয়। তাই হামে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা খরচ সরকারিভাবে বহনের প্রস্তাব দেন তিনি।

সবশেষে ডা. তাসনিম জারা বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব নতুন কোনো সমস্যা নয় এবং এটি নিয়ন্ত্রণের বৈজ্ঞানিক ও প্রমাণভিত্তিক উপায় বিদ্যমান। তবে এর জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয় এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ।

তিনি আরও বলেন, এই সংকট শেষ হলে ভবিষ্যতে কেন এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। এজন্য একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনেরও আহ্বান জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তাসনিম জারার এই প্রস্তাবগুলো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে এবং হামের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত