প্রকাশ: ২০ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নরওয়ে সফরে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার ইস্যুতে একাধিক প্রশ্নের মুখে পড়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন তিনি, যা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে নরওয়ে সফরের সময় আয়োজিত এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে, যেখানে নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী জোনাস গাহর স্টোরে–এর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন নরেন্দ্র মোদি। বৈঠকে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে বক্তব্য দেন।
সংবাদ সম্মেলন শেষে দুই নেতা মঞ্চ ত্যাগ করার সময় নরওয়েজিয়ান সাংবাদিক হেলে লিং ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন। তিনি জানতে চান, বিশ্বের অন্যতম স্বাধীন গণমাধ্যমের পরিবেশে থেকেও কেন মোদি সরাসরি সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখোমুখি হন না। কিন্তু প্রশ্নটি শেষ হওয়ার আগেই মোদি কোনো মন্তব্য না করে মঞ্চ ত্যাগ করেন।
এই ঘটনার পর বিষয়টি দ্রুত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই এটিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন এবং কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে অস্বস্তিকর মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করেন।
পরবর্তীতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পশ্চিমাঞ্চল বিষয়ক সচিব সিবি জর্জ এক ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। সেখানে আবারও একই সাংবাদিক মানবাধিকার, সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং আন্তর্জাতিক আস্থার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানতে চান, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন বিশ্ব ভারতের ওপর আস্থা রাখবে এবং প্রধানমন্ত্রী মোদি কি কখনও ভারতীয় গণমাধ্যমের কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হবেন।
জবাবে সিবি জর্জ ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক ভূমিকাকে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ভারত একটি সভ্যতাভিত্তিক রাষ্ট্র, যা দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময় ভারতের টিকা ও ওষুধ সরবরাহের বিষয়টি তিনি উল্লেখ করেন, যা বহু দেশকে সহায়তা করেছে বলে দাবি করেন।
ব্রিফিং চলাকালে সাংবাদিকের ধারাবাহিক প্রশ্নে কিছুটা বিরক্তি প্রকাশ করেন সিবি জর্জ। তিনি বলেন, প্রশ্ন করা গণতান্ত্রিক অধিকার হলেও কীভাবে তার জবাব দিতে হবে তা নির্ধারণ করা সাংবাদিকদের কাজ নয়। তার মতে, ভারতের ওপর জনসংখ্যার চাপ ও বৈশ্বিক অবদানের পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির ভূমিকা আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, ভারতের সংবিধান নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেছে এবং স্বাধীনতার পর থেকেই দেশটি নারী-পুরুষের সমান অধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী।
এদিকে সাংবাদিক হেলে লিং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) একটি পোস্টে দাবি করেন, তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট উত্তর চেয়েছিলেন। কিন্তু তাদের প্রশ্নের সরাসরি উত্তর পাওয়া যায়নি। তার অভিযোগ অনুযায়ী, ভারতীয় প্রতিনিধিরা মূল প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে কোভিড-১৯ মোকাবিলা এবং যোগব্যায়ামের মতো বিষয় তুলে ধরেন।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, বৈশ্বিক কূটনীতিতে গণমাধ্যমের প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া নতুন নয়, তবে বড় গণতান্ত্রিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে এ ধরনের আচরণ আলোচনার জন্ম দেয়। বিশেষ করে মানবাধিকার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংক্রান্ত প্রশ্ন বারবার উঠে আসায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।
অন্যদিকে ভারত সরকার দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে দেশটিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী এবং গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভারতের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে অনেক সময় রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব থাকে।
তবে নরওয়ে সফরের এই ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মিডিয়া কাভারেজেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে সংবাদ সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনা কূটনৈতিক সফরের ভাবমূর্তি প্রভাবিত করতে পারে, বিশেষ করে যখন প্রশ্নগুলো মানবাধিকার ও গণমাধ্যম স্বাধীনতার মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে কেন্দ্রিত হয়।
সব মিলিয়ে, নরওয়ে সফরে মোদির সংবাদ সম্মেলনের পরের এই ঘটনা শুধু একটি কূটনৈতিক মুহূর্ত নয়, বরং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।