হাবিপ্রবির গবেষণায় কৃষিতে নতুন বিপ্লব

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২১ মে, ২০২৬
  • ৪ বার
হাবিপ্রবির গবেষণায় কৃষিতে নতুন বিপ্লব

প্রকাশ: ২১ মে ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দিনাজপুরের হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) গবেষক দলের এক গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যে দেশের কৃষিখাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এ গবেষণায় দেখা গেছে, আলু চাষে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে একই সঙ্গে উচ্চ ফলন নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশেষ করে ব্যাকটেরিয়ার সহায়তায় গড়ে ওঠা এই নতুন প্রযুক্তি কৃষিকে আরও নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং লাভজনক করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গবেষণায় ব্যবহৃত হয়েছে গ্রানুলা জাতের আলু, যেখানে প্রচলিত ইউরিয়া ও ফসফেট সারের মাত্র ৫০ শতাংশ ব্যবহার করেও প্রায় সমান ফলন পাওয়া গেছে। এ সাফল্যের পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়ার একটি বিশেষ কনসোর্টিয়াম, যা উদ্ভিদের ভেতরে বসবাস করে প্রাকৃতিকভাবে পুষ্টি শোষণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে।

এই গবেষণার মাঠপর্যায়ের নেতৃত্ব দেন হাবিপ্রবির কৃষি অনুষদের বায়োকেমিস্ট্রি ও মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক। তিনি জানান, দীর্ঘদিনের গবেষণার লক্ষ্য ছিল রাসায়নিক ইনপুট কমিয়ে এমন একটি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা, যা কৃষকদের উৎপাদন খরচ কমাবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা করবে।

গবেষণার অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হলো, এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বা হরমোন স্প্রে করার প্রয়োজন হয়নি। সাধারণ আলু চাষে যেখানে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিভিন্ন রাসায়নিক স্প্রে করতে হয়, সেখানে এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে সম্পূর্ণ স্প্রেমুক্ত চাষ সম্ভব হয়েছে। এতে শুধু খরচ কমেনি, বরং উৎপাদিত আলু রোগমুক্ত ও তুলনামূলকভাবে বেশি টেকসই হয়েছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।

গবেষকরা আরও জানিয়েছেন, এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের ফলে আলু গাছের পাতা ও শিকড়ে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা উদ্ভিদের প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে। পাশাপাশি মাটির ভেতরে উপকারী অণুজীবের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

মাঠপর্যায়ে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ইতিবাচক ফল পেয়েছেন স্থানীয় কৃষকরাও। কাহারোল উপজেলার সাইনগর গ্রামের কৃষক দুলাল হোসেন জানান, নতুন পদ্ধতিতে চাষের পর তাকে আর আলু ক্ষেতে কোনো ধরনের স্প্রে করতে হয়নি। এতে তার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং একই সঙ্গে লাভও বেড়েছে। তিনি জানান, প্রচলিত পদ্ধতিতে যেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ হতো, নতুন প্রযুক্তিতে সেই লাভ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বলে তিনি মনে করছেন।

কৃষি সংশ্লিষ্ট আরেক কর্মকর্তা নওসিন তামান্না জানান, এই গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদিত আলুর গুণগত মান তুলনামূলকভাবে বেশি ভালো পাওয়া গেছে। আলুর বাইরের আবরণ শক্ত হওয়ায় তা সহজে নষ্ট হয় না এবং সংরক্ষণযোগ্যতা ৩ থেকে ৪ মাস পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। এটি বাজারজাতকরণ ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রযুক্তির উদ্ভাবক ড. আজিজুল হক বলেন, কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক করার জন্য রাসায়নিক নির্ভরতা কমানো এখন সময়ের দাবি। এন্ডোফাইটিক ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা দেখাতে সক্ষম হয়েছি যে কম সার ও প্রায় শূন্য কীটনাশক ব্যবহার করেও উচ্চ ফলন পাওয়া সম্ভব। এটি শুধু আলু নয়, ভবিষ্যতে অন্যান্য ফসলেও প্রয়োগ করা গেলে দেশের কৃষি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই গবেষণার ফলাফল জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা United Nations এর এসডিজি কাঠামোর সঙ্গে সরাসরি সামঞ্জস্যপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষুধামুক্ত বিশ্ব, দায়িত্বশীল উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং স্থলজ বাস্তুতন্ত্র সংরক্ষণে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

গবেষণাটি অর্থায়ন করেছে BRAC এর মাইক্রোফাইন্যান্স প্রকল্প, যা প্রান্তিক কৃষকদের জন্য আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি সঠিকভাবে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই প্রযুক্তি বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়নের আগে আরও দীর্ঘমেয়াদি মাঠপর্যায়ের পরীক্ষা ও কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। কারণ যেকোনো নতুন কৃষি প্রযুক্তি টেকসই করতে হলে স্থানীয় পরিবেশ ও কৃষি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করা জরুরি।

সব মিলিয়ে হাবিপ্রবির এই গবেষণা দেশের কৃষি খাতে একটি সম্ভাবনাময় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাসায়নিক নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের যে দিগন্ত এই গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত হয়েছে, তা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের কৃষিকে আরও আধুনিক ও টেকসই পথে এগিয়ে নিতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত