সর্বশেষ :
জীবননগরে আইসিটি কর্মকর্তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, তদন্তে পুলিশ টানা পাঁচ দিন দেশজুড়ে বৃষ্টির সম্ভাবনা, স্বস্তি মিলতে পারে তাপদাহ থেকে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য কঠোর নির্দেশনা, দায়িত্ব পালনে গাফিলতি না করার সতর্কবার্তা অবৈধ গ্যাস সংযোগে চুন কারখানা, রাষ্ট্রের কোটি টাকার ক্ষতির অভিযোগে দুইজন কারাগারে কবি আল মুজাহিদীর মৃত্যুতে শোকের ছায়া হামলা হলে ন্যাটোকে বিধ্বংসী জবাব দেবে রাশিয়া লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষে নিহত ৪ ইসরাইলি সেনা, বাড়ছে উত্তেজনা সাঘাটায় যমুনা নদীর তীররক্ষা বাঁধে ধস, আতঙ্কে শতাধিক পরিবার আড়াই ঘণ্টার পতাকা বৈঠকেও মিলল না ডিপজলের খোঁজ, উদ্বেগে পরিবার সাতক্ষীরায় পৃথক স্থান থেকে তিন ব্যক্তির লাশ উদ্ধার, এলাকায় চাঞ্চল্য

চীনে কম খরচে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৯ জুন, ২০২৬
  • ৪১ বার

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশি ক্যানসার রোগীদের জন্য সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের তুলনায় কম খরচে উন্নত চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা জানিয়েছে চীনের গুয়াংজু মডার্ন ক্যানসার হাসপাতাল। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, বর্তমানে প্রতি মাসে গড়ে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন। ঢাকায় আয়োজিত এক আলোচনা সভায় হাসপাতালটির পক্ষ থেকে এসব তথ্য জানানো হয়।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর গুলশানে বাংলাদেশ-চায়না আপন মিডিয়া ক্লাব ও বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরাম আয়োজিত অনুষ্ঠানে হাসপাতালটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ও আন্তর্জাতিক বিভাগের পরিচালক হি ল্যাংবিং এ তথ্য তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে হাসপাতালটির অনকোলজি বিশেষজ্ঞ উ উই এবং বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ উপস্থিত ছিলেন।

হি ল্যাংবিং বলেন, বিদেশি রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে গুয়াংজু মডার্ন ক্যানসার হাসপাতালের দুই দশকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার দাবি, হাসপাতালটি আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা জেসিআইয়ের সনদপ্রাপ্ত। ক্যানসারের আধুনিক ও ন্যূনতম আক্রমণাত্মক চিকিৎসাপদ্ধতি সেখানে ব্যবহার করা হয়। ফুসফুস ও স্তন ক্যানসারের চিকিৎসার পাশাপাশি ভবিষ্যতে লিভার ও অগ্ন্যাশয়ের রোগের জন্য পৃথক বিভাগ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

তিনি আরও জানান, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১০৩টি দেশের রোগী এই হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন। কয়েক বছর ধরেই বাংলাদেশি রোগীরা সেখানে যাচ্ছেন। তবে গত বছর থেকে বাংলাদেশি রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তার ভাষায়, বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ৩০ জন বাংলাদেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে যাচ্ছেন।

ক্যানসার চিকিৎসা বাংলাদেশের অনেক পরিবারের জন্য বড় আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ। রোগ ধরা পড়ার পর চিকিৎসা পরিকল্পনা, পরীক্ষা, অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ওষুধ, হাসপাতাল খরচ এবং বিদেশে যাতায়াত, সব মিলিয়ে পরিবারগুলো দ্রুত বিপদে পড়ে। অনেক রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা অন্য দেশে যান। সেই জায়গায় চীন কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ দিতে চাইছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

অনকোলজি বিশেষজ্ঞ উ উই বলেন, চিকিৎসার সময় রোগীদের শারীরিক অবস্থা যেন আরও খারাপ না হয়, সে বিষয়ে হাসপাতালটি গুরুত্ব দেয়। কেমোথেরাপি ও রেডিওথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কমাতে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তার দাবি, ক্যানসার চিকিৎসায় ন্যূনতম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি ব্যবহার করলে অনেক রোগীর কষ্ট কমতে পারে এবং চিকিৎসার পর দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা বাড়ে।

তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ক্যানসারের ফলাফল রোগভেদে আলাদা হয়। রোগের ধরন, ধাপ, রোগীর বয়স, শরীরের সামগ্রিক অবস্থা, আগের চিকিৎসা, জেনেটিক বৈশিষ্ট্য এবং চিকিৎসা শুরুর সময় ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলে। তাই কোনো হাসপাতালের সাফল্যের দাবি যাচাই করতে হলে রোগীভিত্তিক তথ্য, চিকিৎসা পদ্ধতি, দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল এবং স্বাধীন মূল্যায়ন দেখা জরুরি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, চিকিৎসা নেওয়া বাংলাদেশি রোগীদের অনেকের জীবনমানের উন্নতি হয়েছে। কেউ কেউ ক্যানসারমুক্তও হয়েছেন। তবে এ ধরনের দাবি সাধারণত চিকিৎসা নথি ও বৈজ্ঞানিক তথ্য দিয়ে যাচাই করা দরকার। ক্যানসার রোগীর পরিবারগুলোর জন্য তাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের দ্বিতীয় মতামত নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

হি ল্যাংবিং বলেন, তাদের হাসপাতালের খরচ ভারতের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে। তবে সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। তিনি জানান, বাংলাদেশি রোগীদের সুবিধার জন্য ঢাকায় একটি পরামর্শক কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখান থেকে চিকিৎসাসংক্রান্ত প্রাথমিক তথ্য, যোগাযোগ ও পরামর্শ পাওয়া যাবে।

বাংলাদেশি রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্রুত রোগ নির্ণয়, উন্নত প্রযুক্তি, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সহজ প্রাপ্যতা এবং হাসপাতালের সমন্বিত সেবা। অনেক পরিবার দেশে চিকিৎসা শুরু করলেও পরবর্তী ধাপে বিদেশে যায়। কেউ যায় জটিল অস্ত্রোপচারের জন্য। কেউ যায় উন্নত রেডিওথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপির জন্য। আবার কেউ যায় চিকিৎসার দ্বিতীয় মতামত নিতে।

এই বাস্তবতায় চীনা হাসপাতালের আগ্রহ বাংলাদেশি রোগীদের জন্য নতুন বিকল্প তৈরি করতে পারে। তবে বিদেশে চিকিৎসার আগে রোগী ও পরিবারের কয়েকটি বিষয় জানা জরুরি। চিকিৎসার মোট সম্ভাব্য খরচ কত হবে, কতদিন থাকতে হবে, অনুবাদ সুবিধা আছে কি না, চিকিৎসার পর ফলোআপ কীভাবে হবে, জরুরি জটিলতা হলে কী ব্যবস্থা থাকবে এবং রোগীর মেডিকেল রেকর্ড দেশে ফিরে কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, এসব বিষয় পরিষ্কার না হলে ঝুঁকি থেকে যায়।

ক্যানসার চিকিৎসায় শুধু হাসপাতাল বেছে নেওয়া যথেষ্ট নয়। রোগ নির্ণয়ের সঠিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় একই রোগীর রিপোর্ট একাধিকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। তাই বায়োপসি, ইমেজিং, স্টেজিং এবং মলিকুলার টেস্ট ঠিকভাবে করা দরকার। এসব তথ্যের ওপরই চিকিৎসা পরিকল্পনা নির্ভর করে। রোগীর জন্য অস্ত্রোপচার, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, ইমিউনোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি বা প্যালিয়েটিভ কেয়ার, কোনটি দরকার, তা বিশেষজ্ঞ দল ঠিক করে।

গুয়াংজু মডার্ন ক্যানসার হাসপাতাল নিজেদের সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে পরিচয় দিয়েছে। তাদের ওয়েবসাইটে হাসপাতালটি চীন-সিঙ্গাপুর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এবং ২০১৪ সালে জেসিআই স্বীকৃতি পাওয়ার তথ্য উল্লেখ করেছে। জেসিআই স্বীকৃতি হাসপাতালের মান ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও সেবার মানের একটি আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন হিসেবে পরিচিত। তবে কোনো হাসপাতাল বেছে নেওয়ার আগে রোগীদের বর্তমান স্বীকৃতি, চিকিৎসকের যোগ্যতা এবং বাস্তব রোগী অভিজ্ঞতা যাচাই করা উচিত।

বাংলাদেশে ক্যানসার চিকিৎসার চাপ দিন দিন বাড়ছে। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে রোগীর ভিড়, বিশেষজ্ঞের ঘাটতি, রেডিওথেরাপি মেশিনের সীমাবদ্ধতা এবং উচ্চ খরচ অনেক রোগীর চিকিৎসা কঠিন করে তোলে। ফলে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসা মানেই সব সময় সহজ সমাধান নয়। ভাষা, ভিসা, যাতায়াত, থাকার খরচ, খাবার, রোগীর শারীরিক দুর্বলতা এবং চিকিৎসা-পরবর্তী ফলোআপ বড় চ্যালেঞ্জ।

তাই বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে রোগীর বর্তমান চিকিৎসক বা অনকোলজি বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত। রোগীর অবস্থা যদি স্থিতিশীল না থাকে, দীর্ঘ বিমানযাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আবার কিছু চিকিৎসা দেশে সম্ভব হলেও রোগী অপ্রয়োজনে বড় খরচে বিদেশে যেতে পারেন। তাই সিদ্ধান্ত হতে হবে তথ্যভিত্তিক, আবেগভিত্তিক নয়।

চীনা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা বাংলাদেশি রোগীদের জন্য ঢাকায় পরামর্শক কেন্দ্র চালু করেছে। এটি রোগী ও পরিবারের জন্য যোগাযোগ সহজ করতে পারে। তবে পরামর্শক কেন্দ্র যেন রোগীকে শুধু বিদেশে পাঠানোর মাধ্যম না হয়, বরং সঠিক তথ্য, বাস্তব খরচ, চিকিৎসার সম্ভাবনা ও ঝুঁকি স্পষ্টভাবে জানায়, সেটি জরুরি।

বাংলাদেশ-চীন স্বাস্থ্য সহযোগিতার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ক্যানসার চিকিৎসা, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি বিনিময় এবং রোগী রেফারেল ব্যবস্থায় দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ার সুযোগ আছে। তবে রোগী সুরক্ষা, চিকিৎসার মান, খরচের স্বচ্ছতা এবং ফলোআপ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

বাংলাদেশি রোগীদের জন্য সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা। অনেক পরিবার জমি বিক্রি করে, ঋণ নিয়ে বা আত্মীয়দের সাহায্যে ক্যানসার চিকিৎসা করায়। তাই কম খরচের দাবি তাদের জন্য আকর্ষণীয়। কিন্তু ক্যানসারের মতো গুরুতর রোগে শুধু খরচ কম হলেই হবে না। চিকিৎসা কার্যকর, নিরাপদ এবং রোগীর অবস্থার সঙ্গে মানানসই হতে হবে।

সব মিলিয়ে গুয়াংজু মডার্ন ক্যানসার হাসপাতালের বক্তব্য বাংলাদেশি ক্যানসার রোগীদের জন্য একটি নতুন চিকিৎসা বিকল্পের খবর দিচ্ছে। হাসপাতালটি সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ডের তুলনায় কম খরচে উন্নত সেবা দেওয়ার দাবি করেছে। প্রতি মাসে অন্তত ৩০ জন বাংলাদেশি রোগী সেখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন বলেও জানিয়েছে। তবে রোগী ও পরিবারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। চিকিৎসকের পরামর্শ, খরচের লিখিত ধারণা, রোগভিত্তিক চিকিৎসা পরিকল্পনা এবং ফলোআপ ব্যবস্থা জেনে তারপর বিদেশে চিকিৎসার পথে এগোনো উচিত।

ক্যানসার চিকিৎসা শুধু একটি হাসপাতালের বিষয় নয়। এটি রোগী, পরিবার, চিকিৎসক, অর্থনীতি এবং মানবিক সহায়তার লড়াই। তাই বাংলাদেশি রোগীদের জন্য যেকোনো নতুন সুযোগকে স্বাগত জানানো যায়। তবে সেই সুযোগ যেন নিরাপদ, স্বচ্ছ ও রোগীকেন্দ্রিক হয়, সেটিই সবচেয়ে জরুরি।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত