মধ্যপ্রাচ্যে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে ইরাকে ইরান-সমর্থিত গোপন সশস্ত্র নেটওয়ার্ক বা ‘স্লিপার সেল’ সক্রিয় থাকার অভিযোগ আবারও সামনে এসেছে। পশ্চিমা গোয়েন্দা সূত্র এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের দাবি, সম্ভাব্য সংঘাতের পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, কূটনৈতিক স্থাপনা এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর জন্য এসব নেটওয়ার্ককে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
যদিও তেহরান আনুষ্ঠানিকভাবে এ ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে, তবুও ইরাককে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরাক বর্তমানে এমন একটি ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্র যেখানে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান।
২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন অভিযানের পর ইরাকের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। সেই সময় থেকে দেশটিতে বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উত্থান ঘটে, যাদের অনেকের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সম্পর্ক রয়েছে বলে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, ইরাকে সক্রিয় কিছু গোষ্ঠী নিজেদেরকে জাতীয় প্রতিরোধ আন্দোলনের অংশ হিসেবে পরিচয় দিলেও তাদের ওপর বিদেশি প্রভাবের অভিযোগ বহুবার উঠেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে এসব গোষ্ঠীর কার্যক্রমও আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত তাদের সেনা ও কূটনৈতিক মিশনের নিরাপত্তা বর্তমানে অন্যতম অগ্রাধিকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে একাধিক রকেট ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। যদিও এসব হামলার দায় সবসময় স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি, তবুও ওয়াশিংটন বেশ কয়েকবার ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে।
অন্যদিকে ইরানের অবস্থান হলো, তারা আঞ্চলিক দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে না এবং স্থানীয় প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়। তেহরানের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার মূল কারণ হলো বিদেশি সামরিক উপস্থিতি।
ইরাকের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। একদিকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখতে চায়, অন্যদিকে প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং ধর্মীয় সম্পর্কও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফলে দুই শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা বাগদাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথাকথিত গোপন সেল বা স্লিপার সেলের ধারণা আধুনিক সংঘাতে নতুন নয়। এসব নেটওয়ার্ক সাধারণত দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় অবস্থায় থেকে নির্দিষ্ট নির্দেশনা বা পরিস্থিতির অপেক্ষায় থাকে। সংকট দেখা দিলে তারা দ্রুত সক্রিয় হয়ে হামলা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ বা লজিস্টিক সহায়তার মতো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।
তবে ইরাকে এমন কোনো গোপন নেটওয়ার্ক কতটা সক্রিয় বা সংগঠিত, সে বিষয়ে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা তথ্য খুব সীমিত। অনেক সময় গোয়েন্দা তথ্য, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে পার্থক্য থাকে। ফলে এ ধরনের দাবিকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে যেখানে ছোট কোনো ঘটনা থেকেও বড় ধরনের উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে মার্কিন বাহিনী, আঞ্চলিক মিত্র রাষ্ট্র এবং বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যদি সত্যিই কোনো গোপন নেটওয়ার্ক মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে হামলার প্রস্তুতি নিয়ে থাকে, তাহলে তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নয়, পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য নতুন ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে এর ফলে ইরাকের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কূটনৈতিক মহল মনে করছে, উত্তেজনা কমাতে সংলাপ এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার করা এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সামরিক সংঘাতের যেকোনো বিস্তার শুধু সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর নয়, বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ইরাকে ইরানের গোপন সেল সক্রিয় থাকার অভিযোগ নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করলেও এর বাস্তবতা নিয়ে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে। তবে এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো নিরাপত্তা ইস্যু দ্রুত আন্তর্জাতিক গুরুত্ব পেতে পারে এবং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে প্রভাবিত করতে পারে।