দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের সংক্রমণ বাড়তে থাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জনস্বাস্থ্য খাতে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মতে, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকলেও নির্ধারিত সময়ে হাম প্রতিরোধী টিকা গ্রহণ করেনি। এমনকি হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক রোগীর ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, তারা প্রয়োজনীয় টিকা থেকে বঞ্চিত ছিল।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ হলেও সময়মতো টিকা গ্রহণের মাধ্যমে এটি সহজেই প্রতিরোধ করা সম্ভব। কিন্তু টিকাদানে অনীহা, সচেতনতার অভাব, তথ্যগত বিভ্রান্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও অনেক শিশু ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু এক বা একাধিক ডোজ টিকা পায়নি। এতে রোগের জটিলতা বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজনও বাড়ছে।
স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, অনেক অভিভাবক মনে করেন শিশু সুস্থ থাকলে টিকা না দিলেও সমস্যা নেই। আবার কেউ কেউ ভুল তথ্য বা গুজবের কারণে টিকা গ্রহণে অনীহা দেখান। এর ফলে শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতায় ঘাটতি তৈরি হয় এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম শুধু জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়ির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গুরুতর ক্ষেত্রে এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, অপুষ্টি, চোখের জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এ রোগ বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অনেক ক্ষেত্রে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তার টিকাদান ইতিহাস যাচাই করে দেখা যায় যে নির্ধারিত টিকা সম্পূর্ণ হয়নি। কিছু পরিবার আবার টিকাদান কার্ড সংরক্ষণ না করায় সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি দেশের অন্যতম সফল উদ্যোগ হলেও প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, দুর্গম এলাকা এবং কিছু শহুরে বস্তিতে এখনও শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। এসব এলাকায় বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন।
চিকিৎসকদের মতে, টিকা গ্রহণে পিছিয়ে থাকা শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা জরুরি। এজন্য স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মী, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন করতে নিয়মিত প্রচারণা চালানোরও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। যেসব এলাকায় সংক্রমণের হার বেশি, সেখানে বিশেষ কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে। একই সঙ্গে নিয়মিত টিকাদান সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, শুধু টিকা সরবরাহ করলেই হবে না; মানুষের মধ্যে আস্থা ও সচেতনতা তৈরি করাও জরুরি। কারণ অনেক সময় ভুল ধারণা ও সামাজিক গুজব টিকাদান কর্মসূচিকে বাধাগ্রস্ত করে।
অভিভাবকদের প্রতি বিশেষজ্ঞদের আহ্বান, শিশুদের বয়স অনুযায়ী নির্ধারিত সব টিকা সময়মতো গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো টিকা বাদ পড়লে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করে তা দ্রুত সম্পন্ন করার পরামর্শও দিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, হাম প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হলো টিকা। তাই হাসপাতালের শয্যায় রোগী বাড়ার আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। অন্যথায় সংক্রমণ আরও বিস্তার লাভ করতে পারে।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টদের মতে, টিকাদানের হার বৃদ্ধি, সচেতনতা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারির মাধ্যমে হামের বিস্তার নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। এজন্য সরকার, স্বাস্থ্যকর্মী এবং অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া অনেক হামের রোগীর টিকা না পাওয়ার তথ্য নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিরোধই একমাত্র কার্যকর উপায়। তাই শিশুদের টিকাদানে কোনো ধরনের অবহেলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।