বাংলাদেশের রফতানি খাতকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর নীতিসহায়তা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাজার বহুমুখীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সহায়ক নীতি বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী বছরগুলোতে দেশের বার্ষিক রফতানি আয় ১৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করতে সক্ষম হবে।
রাজধানীতে আয়োজিত একটি ব্যবসা ও বাণিজ্যবিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ রফতানি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে এখন নতুন কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার দিকে নজর দিতে হবে।
মন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক শিল্প দেশের রফতানি আয়ের প্রধান চালিকাশক্তি হলেও শুধু একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এজন্য ওষুধ, চামড়া, কৃষিপণ্য, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল এবং জাহাজ নির্মাণসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোকে আরও বেশি সহায়তা দিতে হবে।
তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পণ্যের মান উন্নয়নের বিকল্প নেই। পাশাপাশি রফতানিকারকদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নতুন বাজার খুঁজে বের করার পাশাপাশি বিদ্যমান বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতে হবে। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বাইরে মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা, পূর্ব এশিয়া এবং লাতিন আমেরিকার বাজারেও বাংলাদেশের রফতানি সম্প্রসারণের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, রফতানি আয় বৃদ্ধির জন্য কেবল উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, বরং বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবহন অবকাঠামো এবং কাস্টমস কার্যক্রমকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করতে হবে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা আরও বাড়বে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, রফতানি খাতের উন্নয়নে সরকারি সহায়তা এবং বেসরকারি খাতের উদ্ভাবনী উদ্যোগ একসঙ্গে কাজ করলে বাংলাদেশ আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। তারা করনীতি, ব্যাংকিং সুবিধা এবং ব্যবসা পরিচালনার জটিলতা কমানোরও দাবি জানান।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে নিজের অবস্থান তৈরি করেছে। তবে ১৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য অর্জনের জন্য উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, বৈশ্বিক অর্থনীতির পরিবর্তনশীল পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন দেশের বাণিজ্যনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। একই সঙ্গে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের ওপর গুরুত্ব দিলে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়বে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকার রফতানিমুখী শিল্পের উন্নয়নে বিভিন্ন ধরনের নীতিগত সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে। ভবিষ্যতেও উদ্যোক্তাদের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দেশের রফতানি খাত নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা অর্জনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রফতানি খাতকে আরও প্রতিযোগিতামূলক করতে হবে, যাতে বৈশ্বিক বাজারে দেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়।
অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী উদ্যোক্তারা মনে করেন, সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিসহায়তা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের রফতানি খাত আগামী দশকে নতুন রেকর্ড গড়তে সক্ষম হবে।
সব মিলিয়ে, রফতানি আয়ের নতুন লক্ষ্য সামনে রেখে সরকার ও ব্যবসায়ী মহল উভয়েই আশাবাদী। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রয়োজনীয় নীতিসহায়তা ও সংস্কার কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের রফতানি আয় ভবিষ্যতে ১৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বাস্তব রূপ নিতে পারে।