পরনিন্দা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকার ইসলামী নির্দেশ

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ৬ জুলাই, ২০২৬
  • ৭৬ বার
পরনিন্দা ও সমালোচনা থেকে দূরে থাকার ইসলামী নির্দেশ

প্রকাশ: ০৬ জুলাই  ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

মানুষের জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অথচ উপেক্ষিত বিষয় হলো জিহ্বা ও চিন্তার নিয়ন্ত্রণ। সমাজ এবং ব্যক্তিগত জীবনে শান্তি বজায় রাখার জন্য ইসলাম যে সকল দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো অন্যের সমালোচনা, পরনিন্দা এবং মানুষের গোপন দোষ খুঁজে বের করার প্রবণতা থেকে বিরত থাকা। কর্মহীন ও অলস মস্তিষ্কই সাধারণত মানুষের দোষ-ত্রুটি অনুসন্ধানে ব্যস্ত থাকে। যে ব্যক্তি নিজের জীবনের কোনো গঠনমূলক লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারে না, সে প্রায়শই অন্যদের জীবন নিয়ে নেতিবাচক আলোচনায় লিপ্ত হয়। অথচ ইসলামের শিক্ষা অনুযায়ী, প্রতিটি মুহূর্ত মূল্যবান এবং তা সৎকাজে ব্যয় করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব। মানুষের সমালোচনা করা বা গিবত করা কেবল সামাজিক অপরাধ নয়, এটি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত গর্হিত একটি কাজ।

ইসলামের শিক্ষা অত্যন্ত স্পষ্ট—একজন মুমিন বান্দার দোষ-ত্রুটি গোপন রাখা এবং একে অপরের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। কোরআনে কারিমে আল্লাহ তাআলা সুরা হুজুরাতের ১২ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত কঠোরভাবে এই বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা অধিকাংশ ধারণা থেকে দূরে থাকো, কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ। এই আয়াতে মানুষের গোপন বিষয় অনুসন্ধান করতে নিষেধ করা হয়েছে এবং অন্যের পেছনে গিবত বা নিন্দা করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। মহান আল্লাহ এই গর্হিত কাজটিকে মৃত ভাইয়ের গোশত খাওয়ার সাথে তুলনা করেছেন, যা শুনেই যেকোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন মানুষ শিউরে ওঠে। অথচ আমাদের সমাজে আজ পরনিন্দা ও সমালোচনা যেন এক সাধারণ অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

ইসলামি আইনবিদ ও তাফসীরকারকগণ এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন যে, বিনা প্রয়োজনে বা অহেতুক সন্দেহবশত কারো প্রতি কুধারণা পোষণ করা ইসলামী সমাজব্যবস্থায় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অনেক সময় ভালো ও আল্লাহভীরু লোকদের সম্পর্কেও ভিত্তিহীন ধারণা পোষণ করা হয়, যা মিথ্যা অপবাদের পর্যায়ে পড়ে। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্টভাবে বলেছেন, তোমরা কুধারণা থেকে দূরে থাকো। কারণ, ধারণা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং মানুষের মাঝে বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। তবে অবশ্যই এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। যে ব্যক্তি বাহ্যিকভাবে ভালো বা ধার্মিক, তার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ ছাড়া মন্দ ধারণা করা পাপ। কিন্তু যারা প্রকাশ্যে পাপাচারে লিপ্ত, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকা বা তাদের মন্দ কাজের নিন্দা করা সেই কুধারণার অন্তর্ভুক্ত নয়, যা এখানে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

ইসলামের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানুষের দোষ গোপন রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, যদি তোমরা কারো কোনো দোষ বা স্খলন সম্পর্কে জানতে পারো, তবে তা মানুষের কাছে প্রচার না করে গোপন করে রাখো। কারণ, দোষ খুঁজে বের করার চেষ্টা করা বা অন্যের পেছনে গুপ্তচরবৃত্তি করা ইসলামের আদর্শের পরিপন্থী। কোনো ব্যক্তির দোষ প্রচার করা এবং তার বদনাম রটানো যে সমাজকে কতটুকু কলুষিত করতে পারে, তা আজকের যুগের হানাহানি ও পারস্পরিক হিংসার দিকে তাকালেই বোঝা যায়। গিবত বা সমালোচনা হলো এমন একটি কাজ, যেখানে একজনের অনুপস্থিতিতে তার অপছন্দনীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়। এটি কোনোভাবেই একজন আদর্শ মুসলিমের কাজ হতে পারে না।

উলামায়ে কেরাম মনে করেন, সমালোচনা তখনই বৈধ হতে পারে যখন তা ব্যক্তিগত বিদ্বেষ বা বদনাম করার উদ্দেশ্যে না হয়ে সমাজ ও ঈমানের সুরক্ষার জন্য হয়। যদি কোনো ব্যক্তির কর্মকাণ্ড উম্মাহর বিশ্বাস, ঈমান, আমল বা আকিদার জন্য সরাসরি হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তবে সেই মতবাদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া বা সতর্ক করা জরুরি। এই ধরনের গঠনমূলক আলোচনা বা সমালোচনা ইসলামের দৃষ্টিতে দূষণীয় নয়। বরং যখন ঈমান ও আখলাক বিধ্বংসী কোনো মতবাদ ছড়ানো হয়, তখন চুপ থাকা বরং অন্যায়ের প্রশ্রয় দেওয়ার শামিল। তবে সেই সমালোচনার লক্ষ্য হতে হবে শুধুই সংশোধন, কাউকে ছোট করা বা ব্যক্তিগত আক্রমণ করা নয়।

আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সংকট হলো অন্যের ভালো গুণগুলোর চেয়ে মন্দ দিকগুলো নিয়ে বেশি আগ্রহ। আমরা ভুলে যাই যে, প্রতিটি মানুষই ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে নয়। অন্যের দোষ খুঁজে বের করার চেয়ে নিজের আত্মশুদ্ধিতে মনোনিবেশ করা ইসলামের মূল শিক্ষা। যখন কেউ অন্যের দোষ খোঁজা ছেড়ে দিয়ে নিজের কর্মক্ষেত্রে সময় দেয়, তখন সে ব্যক্তি যেমন ব্যক্তিগতভাবে উন্নতি করে, তেমনি সমাজে শান্তি বজায় থাকে। অযথা সন্দেহ ও সমালোচনার পরিবর্তে একে অপরের প্রতি সহমর্মিতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে তোলাই ইসলামি সমাজব্যবস্থার লক্ষ্য। সমাজকে কলহমুক্ত করতে চাইলে এবং ঘৃণা ও বিদ্বেষের পথ থেকে ফিরে আসতে চাইলে সমালোচনা ও পরনিন্দার অভিশাপ থেকে বের হয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই।

পরিশেষে বলা যায়, একজন প্রকৃত মুসলিমের দায়িত্ব হলো নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখা এবং অন্যের গোপনীয়তা রক্ষা করা। কারো দোষ বা ভুল খুঁজে বের করে তা নিয়ে আনন্দিত হওয়া কিংবা তা প্রচার করা ইসলামের নৈতিক কাঠামোর সম্পূর্ণ বিরোধী। পারস্পরিক হানাহানি, খুনোখুনি ওহিংসা-বিদ্বেষ দূর করার জন্য আমাদের উচিত পরনিন্দা বর্জন করা। আমরা যদি একে অপরের ভাই ও বন্ধু হিসেবে পারস্পরিক শ্রদ্ধার সাথে বসবাস করি, তবেই আমরা একটি সুখী ও সমৃদ্ধ সমাজ গঠন করতে সক্ষম হব। সমালোচনা থেকে দূরে থাকার এই ইসলামি শিক্ষা কেবল ধর্মীয় পালনীয় বিষয় নয়, বরং এটি একটি সুস্থ ও সুন্দর মানবিক জীবনযাপনের মূলমন্ত্র। আমাদের প্রতিটি মুহূর্ত হোক গঠনমূলক এবং পরনিন্দামুক্ত—এই হোক আমাদের জীবনের দৃঢ় অঙ্গীকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com