মির্জাপুরে শিশুকন্যাকে হত্যার পর মায়ের মৃত্যু

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৯ বার
মির্জাপুরে শিশুকন্যাকে হত্যার পর মায়ের মৃত্যু

প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে চার বছরের কন্যাশিশুকে হত্যার পর তার মা আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করছে পুলিশ। শুক্রবার সকালে উপজেলার আনাইতারা ইউনিয়নের ধুপুরিয়া গ্রামে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। নিহত শিশুটির নাম রাজিয়া এবং তার মা কনিকা বেগমের বয়স ২৫ বছর।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর পুরো এলাকায় নেমে আসে শোকের ছায়া। একই পরিবারের মা ও ছোট শিশুর এমন মৃত্যুতে স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট এবং দাম্পত্য জীবনের দীর্ঘদিনের বিরোধই এ ঘটনার পেছনে ভূমিকা রেখেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ।

পুলিশ ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রায় ছয় বছর আগে ধামরাই উপজেলার ঝুরঝুরিয়া গ্রামের কনিকা বেগমের সঙ্গে মির্জাপুরের ধুপুরিয়া গ্রামের রাজিব হোসেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তাদের সংসারে নানা ধরনের কলহ দেখা দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সেই বিরোধ আরও বেড়ে যায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজিব নিয়মিত কাজকর্ম করতেন না এবং মাদকাসক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সংসারে অভাব-অনটন এবং স্ত্রী ও সন্তানের ভরণপোষণ নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রায়ই ঝগড়া হতো। পারিবারিক বিষয় নিয়ে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গেও কনিকার বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলে আশপাশের বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

সংসারের এমন পরিস্থিতির মধ্যে বৃহস্পতিবার রাতেও কনিকা ও তার স্বামীর মধ্যে ঝগড়া হয় বলে জানা গেছে। একপর্যায়ে রাজিব বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। এরপর তিনি আর বাড়িতে ফেরেননি বলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা জানিয়েছেন।

পরদিন শুক্রবার সকালে কনিকা তার চার বছরের মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়ির উদ্দেশে বের হন। তবে বাড়ির সদস্যরা বিষয়টি জানতে পেরে তাদের ফিরিয়ে আনেন। এরপর সকাল ১০টার দিকে বাড়ির অন্যদের অগোচরে ঘরের ভেতরে মা ও মেয়ের মর্মান্তিক পরিণতি ঘটে বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।

পুলিশের ধারণা, কনিকা প্রথমে তার কন্যাশিশু রাজিয়াকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন। পরে নিজে ঘরের ধরনার সঙ্গে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এবং মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তা নিশ্চিত হতে তদন্ত চলছে।

খবর পেয়ে মির্জাপুর থানার পুলিশ ঘটনাস্থলে যায়। পুলিশ মা ও মেয়ের মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল সম্পন্ন করে। পরে মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য টাঙ্গাইল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, পারিবারিক কলহের জেরেই মা তার শিশুকন্যাকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের পর মৃত্যুর বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।

এ ঘটনায় পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একটি শিশুর এমন মৃত্যু বিশেষভাবে নাড়া দিয়েছে এলাকাবাসীকে। স্থানীয়দের অনেকেই বলছেন, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি কীভাবে এমন ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়াল, সেটি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনার ভিত্তিতে মৃত্যুর কারণ চূড়ান্ত করা যাচ্ছে না। পারিবারিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক সংকট, দাম্পত্য কলহ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পারস্পরিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।

কনিকার স্বামী রাজিব ঘটনার সময় বাড়িতে ছিলেন না বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। বৃহস্পতিবার রাতের ঝগড়ার পর তিনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টিও তদন্তের আওতায় রয়েছে। ঘটনার আগে বা পরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কোনো বিরোধ হয়েছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়া গেলে মা ও শিশুর মৃত্যুর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীদের বক্তব্যও তদন্তে বিবেচনা করবে পুলিশ।

মাত্র চার বছরের রাজিয়ার জীবনের এমন আকস্মিক সমাপ্তি স্থানীয়দের মনে গভীর বেদনা তৈরি করেছে। যে বয়সে একটি শিশুর নিরাপদ পরিবেশে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই মায়ের সঙ্গে তার জীবন থেমে গেল। আর একটি পরিবারের দীর্ঘদিনের অশান্তির শেষ পরিণতি হয়ে রইল এমন এক মর্মান্তিক ঘটনা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, ঘটনাটি নিয়ে কোনো ধরনের অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তে না গিয়ে তদন্তের ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করা প্রয়োজন। কী পরিস্থিতিতে শিশুটির মৃত্যু হয়েছে এবং কনিকার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ কী ছিল, তা তদন্ত শেষ হলেই আরও পরিষ্কার হবে।

ঘটনার পর ধুপুরিয়া গ্রামে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। একই সঙ্গে স্থানীয়দের মধ্যে পারিবারিক বিরোধ দ্রুত সমাধান এবং সংকটের সময়ে পরিবারের সদস্যদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। কারণ দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ কখনো কখনো ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে—মির্জাপুরের এই ঘটনা তারই এক হৃদয়বিদারক উদাহরণ হয়ে থাকল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com