ধানমন্ডি ৩২ এখন ধ্বংসস্তূপ, প্রবেশমুখে গাড়ি পার্কিং

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৬
  • ৪৯ বার
ধানমন্ডি ৩২ এখন ধ্বংসস্তূপ, প্রবেশমুখে গাড়ি পার্কিং

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সেই বহুল আলোচিত বাড়িটি এখন আর আগের চেহারায় নেই। একসময় যে ভবনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে পরিচিত ছিল, সেটি এখন অনেকটাই ধ্বংসস্তূপ। আগুনে পোড়া দেয়াল, ভেঙে পড়া কাঠামো, কাঁটাতারের বেষ্টনী এবং গজিয়ে ওঠা লতাপাতার আড়ালে হারিয়ে গেছে ভবনটির পুরোনো পরিচিতি।

এর মধ্যেই ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে দেখা যাচ্ছে আরেক ভিন্ন চিত্র। রাস্তার দুই পাশে এবং লেকসংলগ্ন এলাকায় সারি সারি গাড়ি পার্ক করে রাখা হয়েছে। প্রবেশমুখে রয়েছে পুলিশের ব্যারিকেড। নিরাপত্তার জন্য পুলিশ সদস্যদের পাশাপাশি তাঁবু টানিয়ে পাহারার ব্যবস্থাও রয়েছে। একই এলাকার একটি অংশ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ইজারা দেওয়ার তথ্য সামনে আসায় নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি সরেজমিনে ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ধানমন্ডি লেকসংলগ্ন প্রধান সড়ক থেকে ৩২ নম্বর সড়কে প্রবেশের মুখেই যানবাহনের ভিড়। ফুটপাত ও লেকের পাশের বাঁধানো চত্বরেও রয়েছে বেশ কিছু গাড়ি। প্রবেশপথের বিভিন্ন স্থানে ব্যারিকেড ও ব্যানার টাঙানো। ব্যানারে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, লেকসংলগ্ন চত্বরের একটি অংশ গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য ‘জে অ্যান্ড কো ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

ইজারাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সার্বিক তত্ত্বাবধানকারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া মো. পলাশ আহম্মেদ জানিয়েছেন, তারা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে বৈধ ইজারা নিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে সেখানে গাড়ি পার্কিং কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তাঁর দাবি, ধানমন্ডি লেক ও লেকসংলগ্ন ২ নম্বর সেক্টর এলাকায় তাদের কার্যক্রমের অনুমোদন রয়েছে।

তবে লেকসংলগ্ন নির্দিষ্ট এলাকার বাইরে ৩২ নম্বর সড়ক ও ফুটপাতে গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই গাড়িগুলো তাদের পার্কিং কার্যক্রমের অংশ নয়। রাস্তা বা ফুটপাতে কারা গাড়ি রাখছে, তা তাঁদের জানা নেই বলেও জানান তিনি।

এদিকে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের মূল ভবন ঘিরে রয়েছে কাঁটাতারের বেষ্টনী। ভেতরে প্রবেশের সুযোগ সীমিত। দূর থেকে তাকালে আগুনে পোড়া ভবনের কংক্রিটের কাঠামোর কিছু অংশ এখনও দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। ভবনের আশপাশে গাছপালা ও লতাপাতা বেড়ে জায়গাটি অনেকটা পরিত্যক্ত এলাকার চেহারা নিয়েছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত গাছগুলোতেও নতুন পাতা গজিয়েছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবর্তনের সঙ্গে বিপর্যস্ত স্থাপনার দৃশ্য মিলিয়ে এলাকাটির চেহারায় তৈরি হয়েছে এক অস্বাভাবিক নীরবতা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখনও বিভিন্ন বয়সী মানুষ ধানমন্ডি ৩২ নম্বর দেখতে আসেন। কেউ আসেন কৌতূহল থেকে, কেউ পুরোনো স্মৃতি মনে করতে, আবার কেউ শ্রদ্ধা জানাতে। সড়ক থেকে অনেকেই বিধ্বস্ত ভবনের ভেতরের অংশ দেখার চেষ্টা করেন। কেউ কেউ ছবি তোলারও চেষ্টা করেন। তবে সেখানে দায়িত্ব পালনরত পুলিশের সদস্যরা নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।

একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ধানমন্ডি থানার সদস্যরা ভবনটির নিরাপত্তায় দিন-রাত দায়িত্ব পালন করছেন। ভবিষ্যতে ভবনটি নিয়ে প্রশাসনের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বর্তমান চিত্রের পেছনে রয়েছে গত দুই বছরের একাধিক বড় ঘটনা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিক্ষুব্ধ জনতা বঙ্গবন্ধু ভবনে হামলা, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। ওই সময় ভবনের ভেতরে থাকা বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, বই, নথিপত্র ও অন্যান্য সামগ্রী ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভবনসংলগ্ন আরও কয়েকটি স্থাপনাতেও হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

পরদিন আগুন নেভানোর সময় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘর ও আশপাশের স্থাপনা থেকে কয়েকটি দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার অন্যতম আলোচিত স্থানে পরিণত করে।

এরপর ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ভবনটিতে আবারও ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। পরে এক্সক্যাভেটর, ক্রেন ও বুলডোজার ব্যবহার করে ভবনটির অবশিষ্ট অংশসহ আশপাশের কয়েকটি স্থাপনার কাঠামো ভেঙে ফেলা হয়। পরবর্তী কয়েক দিনও সেখানে ভাঙাভাঙি ও বিভিন্ন সামগ্রী সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে।

বর্তমানে মূল ভবনের সামনে বা আশপাশে আগের মতো কোনো স্মৃতি জাদুঘর নেই। শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি ও শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য ব্যবহৃত আগের কাঠামোরও অস্তিত্ব নেই। লেকসংলগ্ন এলাকায় থাকা বিভিন্ন স্থাপনার চিহ্নও অনেকটাই মুছে গেছে।

এলাকাটির বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি বিষয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে—ধ্বংসস্তূপের চারপাশে কড়া নিরাপত্তা থাকলেও একই এলাকার প্রবেশমুখে গাড়ি পার্কিংয়ের কার্যক্রম চলছে। ফলে স্থানীয়দের পাশাপাশি দর্শনার্থীদের মধ্যেও প্রশ্ন উঠছে, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এই স্থানের ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা কী হবে।

ধানমন্ডি ৩২ শুধু একটি ভবনের নাম নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের দীর্ঘ সময়ের সঙ্গে এর নাম জড়িয়ে আছে। সেই কারণে ভবনটির ধ্বংসাবশেষকে ঘিরে মানুষের আগ্রহও পুরোপুরি শেষ হয়নি। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি স্থাপনা কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, তার ঐতিহাসিক মূল্যায়ন কীভাবে হবে এবং ভবিষ্যতে জায়গাটির ব্যবহার কী হবে—এসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

অন্যদিকে, ৩২ নম্বর সড়কের প্রবেশমুখে গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়টি নগর ব্যবস্থাপনার প্রশ্নও সামনে এনেছে। ফুটপাত ও সড়কের অংশে যানবাহন রাখার ফলে পথচারীদের চলাচল কতটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং ইজারা দেওয়া এলাকার সীমানা ঠিক কোথায়—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে নজরদারির দাবি রাখে।

এখন ধানমন্ডি ৩২ নম্বরকে ঘিরে মূল প্রশ্ন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এই স্থানটির ভবিষ্যৎ কী হবে, নিরাপত্তা ও জনসাধারণের চলাচলের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখা হবে এবং ঐতিহাসিক স্থানের ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী সিদ্ধান্ত নেবে—তা নিয়েই আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

একসময় মানুষের ভিড়ে মুখর থাকা ধানমন্ডি ৩২ এখন অনেকটাই নীরব। কাঁটাতারের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা পোড়া কাঠামো যেন অতীতের একটি অধ্যায়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে। বাইরে ব্যস্ত নগরজীবন স্বাভাবিক গতিতে চললেও সড়কের ভেতরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে ভিন্ন এক বাস্তবতা। ধ্বংসস্তূপ, নিরাপত্তা বেষ্টনী আর গাড়ির সারির মধ্য দিয়ে ধানমন্ডি ৩২ এখন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটি গভীর পরিবর্তনের দৃশ্যমান প্রতীক হয়ে আছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com