নেতানিয়াহুকে ‘চরমপন্থি’ বললেন ইসরাইলের বিরোধী নেতা

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬
  • ৩৫ বার
নেতানিয়াহুকে ‘চরমপন্থি’ বললেন ইসরাইলের বিরোধী নেতা

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬  । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

সিরিয়ায় সাম্প্রতিক ইসরাইলি সামরিক হামলাকে কেন্দ্র করে দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছেন ইসরাইলের বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার গোলান। নেতানিয়াহুকে ‘চরমপন্থি’ ও ‘অবিশ্বস্ত’ ব্যক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি অভিযোগ করেছেন, রাজনৈতিক স্বার্থে সামরিক শক্তির ব্যবহার ইসরাইলের নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

ইয়ার গোলানের এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন সিরিয়ার পরিস্থিতি ঘিরে ইসরাইল ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়ছে। সিরিয়ার দক্ষিণাঞ্চলে সাম্প্রতিক ইসরাইলি বিমান হামলার পর গোলান সতর্ক করে বলেছেন, এ ধরনের পদক্ষেপ শুধু সিরিয়ার সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ককে আরও জটিল করছে না, বরং তুরস্কের সঙ্গেও সম্ভাব্য সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি করছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বক্তব্যে গোলান বলেন, সামরিক শক্তিকে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যবহার করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা মূলত জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ব্যবহার করা উচিত। রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখা কিংবা রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সামরিক অভিযান চালানো হলে তা শেষ পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তাকেই দুর্বল করে দিতে পারে।

ইসরাইলের রাজনীতিতে ইয়ার গোলান একজন পরিচিত বিরোধী নেতা। সাবেক ইসরাইলি সেনা কর্মকর্তা হিসেবে তার সামরিক অভিজ্ঞতা রয়েছে। বর্তমানে তিনি ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নিরাপত্তা ও সামরিক বিষয়ে তার বক্তব্যের কারণে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তার মন্তব্য বিশেষ গুরুত্ব পায়। নেতানিয়াহু সরকারের নীতির বিরোধিতা করে তিনি সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা নিয়ে গোলানের আপত্তির মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে সম্ভাব্য আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা। তার মতে, সিরিয়ায় ইসরাইলের হামলা পরিস্থিতিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি সামরিক উত্তেজনা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে। তুরস্কও সিরিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবশালী শক্তি হওয়ায় দুই দেশের মধ্যে সামরিক সংঘাত তৈরি হলে এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে।

ইসরাইল দীর্ঘদিন ধরে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে আসছে। সিরিয়া থেকে ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র সরবরাহ কিংবা সামরিক অবকাঠামো গড়ে ওঠার আশঙ্কা দেখিয়ে দেশটি বিভিন্ন সময়ে সেখানে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে সিরিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইসরাইলের সামরিক নীতিও নতুন জটিলতার মুখে পড়েছে।

সাম্প্রতিক হামলার পর ইয়ার গোলানের বক্তব্য মূলত সেই বৃহত্তর নিরাপত্তা বিতর্ককেই সামনে এনেছে। তিনি মনে করেন, প্রতিটি সামরিক পদক্ষেপের আগে সম্ভাব্য আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া বিবেচনা করা প্রয়োজন। কারণ সিরিয়া শুধু ইসরাইলের প্রতিবেশী দেশ নয়; দেশটির সঙ্গে তুরস্কসহ একাধিক আঞ্চলিক শক্তির সরাসরি স্বার্থ জড়িয়ে আছে। সেখানে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা বাড়লে অন্য পক্ষগুলোও পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে।

গোলান নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের সমালোচনা করে আরও বলেন, ইসরাইলের এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন যারা সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দেশের নিরাপত্তা জোরদারের জন্য ব্যবহার করবে। তার মতে, রাজনৈতিক টিকে থাকার জন্য নতুন কোনো যুদ্ধ শুরু করা উচিত নয়। তার এই মন্তব্য সরাসরি নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।

ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নেতানিয়াহুকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র মতবিরোধ রয়েছে। তার সরকারের সামরিক নীতি, যুদ্ধ পরিচালনা এবং আঞ্চলিক সম্পর্ক নিয়ে বিরোধী দলগুলো বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুলেছে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের কারণে ইসরাইলি সমাজে নিরাপত্তা, জিম্মি সংকট, সামরিক ব্যয় এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক তীব্র হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে গোলানের বক্তব্য সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।

তবে নেতানিয়াহু সরকারের সমর্থকদের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন। ইসরাইলের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের অবস্থান হলো, প্রতিবেশী দেশগুলোর ভূখণ্ডে ইসরাইলবিরোধী সামরিক অবকাঠামো বা সশস্ত্র গোষ্ঠীর উপস্থিতি তৈরি হলে তা প্রতিরোধ করা প্রয়োজন। তাদের মতে, সম্ভাব্য হুমকি বড় আকার ধারণ করার আগেই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া ইসরাইলের নিরাপত্তা নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে সিরিয়ায় সামরিক হামলা নিয়ে সরকারের অবস্থান এবং বিরোধীদের সমালোচনার মধ্যে মৌলিক রাজনৈতিক পার্থক্য রয়েছে।

সিরিয়ার পরিস্থিতির সঙ্গে তুরস্কের বিষয়টি যুক্ত হওয়ায় নতুন করে কূটনৈতিক উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। সিরিয়ায় তুরস্কের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তরাঞ্চলে তুরস্কের নিরাপত্তা উদ্বেগ, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং সিরিয়ার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে আঙ্কারার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। ফলে ইসরাইলি হামলার মাত্রা বাড়লে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সামরিক বা কূটনৈতিক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইসরাইলের জন্য একদিকে সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অন্যদিকে আঞ্চলিক সংঘাত এড়িয়ে চলা—দুই ধরনের চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। কোনো সামরিক অভিযান যদি স্বল্পমেয়াদে একটি নির্দিষ্ট নিরাপত্তা লক্ষ্য অর্জন করে, কিন্তু তার ফলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর হবে—এই প্রশ্নই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে।

ইয়ার গোলানের বক্তব্যে আরও একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে। ইসরাইলের বিরোধী রাজনীতিতে এখন শুধু সরকারের সামরিক পদক্ষেপের ফলাফল নয়, বরং সেই পদক্ষেপের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। ‘রাজনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যুদ্ধ’—গোলানের এমন মন্তব্য মূলত নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতির ওপর সরাসরি আঘাত। যদিও নেতানিয়াহু ও তার সরকার এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয়।

সিরিয়ায় সাম্প্রতিক হামলার পর ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন আরও দৃশ্যমান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একদিকে সরকার নিরাপত্তার স্বার্থে সামরিক শক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, সামরিক শক্তির অতিরিক্ত ব্যবহার নতুন শত্রু তৈরি করতে পারে এবং দেশের নিরাপত্তা আরও অনিশ্চিত করে তুলতে পারে।

মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতিতে সিরিয়া, ইসরাইল, তুরস্ক এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ফলে সিরিয়ার ভেতরে একটি সামরিক অভিযানও অনেক সময় সীমান্ত ছাড়িয়ে বৃহত্তর কূটনৈতিক ও সামরিক সংকটের জন্ম দিতে পারে। এ কারণেই গোলানের মতো বিরোধী নেতারা ইসরাইল সরকারের প্রতিটি সামরিক সিদ্ধান্তকে শুধু তাৎক্ষণিক নিরাপত্তার দৃষ্টিতে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আঞ্চলিক প্রভাবের দিক থেকেও মূল্যায়নের দাবি জানাচ্ছেন।

এখন দেখার বিষয়, সিরিয়ায় ইসরাইলের সামরিক তৎপরতা সামনে কতটা বাড়ে এবং তুরস্কসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিক্রিয়া কী হয়। একই সঙ্গে ইসরাইলের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে বিরোধীদের চাপও কতটা বাড়ে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। ইয়ার গোলানের সর্বশেষ মন্তব্য সেই রাজনৈতিক চাপেরই একটি বড় প্রকাশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সিরিয়া নিয়ে সামরিক উত্তেজনা যদি আরও বাড়ে, তাহলে এর প্রভাব শুধু সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ওপর সীমাবদ্ধ থাকবে না। মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর অবস্থানও নতুন করে পরিবর্তিত হতে পারে। আর সেই কারণেই ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে ওঠা প্রশ্ন এখন আঞ্চলিক রাজনীতির বৃহত্তর আলোচনার সঙ্গেও যুক্ত হয়ে গেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com