১৬ ডিসেম্বর চালু হচ্ছে শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫২ বার
১৬ ডিসেম্বর চালু হচ্ছে শাহজালালের তৃতীয় টার্মিনাল

প্রকাশ: ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। আগামী ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে টার্মিনালটি চালু করার কথা জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। মঙ্গলবার সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি এ তথ্য জানান।

মন্ত্রী জানিয়েছেন, ১৬ ডিসেম্বর তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরু হলেও এটি একদিনেই পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালনায় যাবে না। ধাপে ধাপে কার্যক্রম বাড়ানো হবে এবং পরবর্তী পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। শুরুর দিনে নতুন টার্মিনাল দিয়ে ২০টি উড়োজাহাজ চলাচল করবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে শাহজালাল বিমানবন্দরের ওপর দীর্ঘদিন ধরে যাত্রী ও উড়োজাহাজের চাপ বাড়ছে। বিদ্যমান অবকাঠামোর সক্ষমতা সীমিত হওয়ায় যাত্রীসেবা, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনা ও উড়োজাহাজ পরিচালনা নিয়ে নানা সময়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই বাস্তবতায় তৃতীয় টার্মিনালকে শুধু একটি নতুন ভবন হিসেবে নয়, বরং দেশের বিমান পরিবহন অবকাঠামোর সক্ষমতা বাড়ানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে দেখা হচ্ছে।

মন্ত্রীর ঘোষণায় ১৬ ডিসেম্বরের সময়সীমা সামনে আসায় বিমানবন্দর ব্যবহারকারী যাত্রীদের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিদেশে যাতায়াতকারী বাংলাদেশি, প্রবাসী কর্মী, ব্যবসায়ী, পর্যটক এবং আন্তর্জাতিক রুটে ভ্রমণকারী যাত্রীদের জন্য নতুন টার্মিনালটি কতটা কার্যকর সেবা দিতে পারে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।

মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনা থেকে অর্জিত আয়ের ২৭ শতাংশ বাংলাদেশ পাবে। একই সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের ৫০ শতাংশ দায়িত্ব পালন করবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স। ফলে টার্মিনাল চালুর পাশাপাশি এর পরিচালন কাঠামো, রাজস্ব বণ্টন এবং গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ব্যবস্থাপনাও বিমান খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের ইতিহাসও দীর্ঘ। ২০১৭ সালে প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। প্রায় ২১ হাজার ৩৯৮ কোটি টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে ২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পের অর্থায়নে বাংলাদেশ সরকারের পাশাপাশি জাপানের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকার ঋণ রয়েছে। সরকার প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে এবং বাকি অর্থ জাইকার ঋণ থেকে এসেছে।

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর তৃতীয় টার্মিনালের আংশিক উদ্বোধন করা হয়েছিল। সে সময় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, পরবর্তী সময়ের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা হবে। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্মাণকাজের দৃশ্যমান অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গ যাত্রীসেবার বাইরে ছিল।

এই বিলম্বের পেছনে নির্মাণ শেষ হওয়ার পর অপারেশনাল প্রস্তুতি, ব্যবস্থাপনা কাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের মতো বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক মানের একটি বিমানবন্দর টার্মিনাল নির্মাণের পর সেটিকে যাত্রী ব্যবহারের উপযোগী করতে শুধু ভবন নির্মাণই যথেষ্ট নয়; নিরাপত্তা, ইমিগ্রেশন, ব্যাগেজ, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং, এয়ারলাইনসের কার্যক্রম, প্রযুক্তি এবং বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত প্রস্তুতিও নিশ্চিত করতে হয়।

এ কারণেই এবার ১৬ ডিসেম্বরের উদ্বোধন বা কার্যক্রম শুরুর ঘোষণা শুধু একটি তারিখ নির্ধারণের বিষয় নয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষ করে বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে টার্মিনাল পরিচালনা করা সম্ভব হবে, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা। বিশেষ করে শুরুতে ২০টি উড়োজাহাজ পরিচালনার মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করে পরবর্তী পাঁচ থেকে ছয় মাসে পূর্ণ সক্ষমতায় যাওয়ার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ধাপে ধাপে সমন্বিত প্রস্তুতি প্রয়োজন হবে।

যাত্রীদের প্রত্যাশার জায়গাটিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। একটি আধুনিক টার্মিনালের মূল সাফল্য শুধু এর স্থাপত্য বা আয়তনে নয়, বরং একজন যাত্রী বিমানবন্দরে প্রবেশ থেকে শুরু করে চেক-ইন, নিরাপত্তা পরীক্ষা, ইমিগ্রেশন, বোর্ডিং এবং ব্যাগেজ সংগ্রহ পর্যন্ত কতটা সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, তার ওপর নির্ভর করে। একইভাবে আগত যাত্রীদের জন্য ইমিগ্রেশন ও ব্যাগেজ ব্যবস্থাপনাও দ্রুত এবং নির্ভরযোগ্য হওয়া জরুরি।

বাংলাদেশের অর্থনীতি, প্রবাসী আয়, রপ্তানি-বাণিজ্য এবং পর্যটনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ শাহজালাল বিমানবন্দর ব্যবহার করেন। ফলে বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়লে এর প্রভাব শুধু যাত্রীসেবায় সীমাবদ্ধ থাকবে না; ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়তে পারে।

তবে নতুন টার্মিনাল চালু হলেই সব সমস্যা একসঙ্গে দূর হয়ে যাবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। নতুন অবকাঠামোর পাশাপাশি দক্ষ জনবল, আধুনিক প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের মান, এয়ারলাইনসের সমন্বয় এবং যাত্রীসেবার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে হবে। পরিচালনার প্রথম কয়েক মাসে এসব ক্ষেত্রে কোনো ঘাটতি দেখা দিলে তা দ্রুত চিহ্নিত করে সমাধান করাও গুরুত্বপূর্ণ হবে।

এদিকে টার্মিনাল পরিচালনা থেকে বাংলাদেশের ২৭ শতাংশ রাজস্ব পাওয়ার বিষয়টিও অর্থনৈতিক দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের পর সেটি কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে আয় ও সেবা—দুই ক্ষেত্রেই সুফল দিতে পারে, সেই বিষয়টি সামনে আসবে। একই সঙ্গে গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিংয়ের অর্ধেক দায়িত্ব বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের হাতে থাকায় জাতীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সের সক্ষমতা ও সেবার মানও যাত্রীদের অভিজ্ঞতার ওপর প্রভাব ফেলবে।

১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসে তৃতীয় টার্মিনালের কার্যক্রম শুরুর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে এটি বাংলাদেশের বিমান পরিবহন খাতে একটি দৃশ্যমান পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে। তবে সেই পরিবর্তনের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে টার্মিনালটি কত দ্রুত, নিরাপদ, স্বচ্ছ ও যাত্রীবান্ধব সেবা দিতে পারছে তার ওপর।

দীর্ঘদিন ধরে নির্মাণাধীন ও অপেক্ষমাণ এই অবকাঠামোকে ঘিরে মানুষের প্রত্যাশা তাই স্বাভাবিকভাবেই বেশি। এখন নজর থাকবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি প্রস্তুতি কতটা সম্পন্ন হয়, প্রথম দিনে ২০টি উড়োজাহাজ পরিচালনার পর কার্যক্রম কীভাবে বাড়ানো হয় এবং ঘোষিত পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পূর্ণাঙ্গ সক্ষমতায় যেতে পারে কি না—তার দিকে। সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তৃতীয় টার্মিনাল শুধু শাহজালাল বিমানবন্দরের সক্ষমতা বাড়াবে না, বরং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমান যোগাযোগের ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com