ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

Reporter Name
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
  • ৫৪ বার
ব্রিকস সম্মেলনে যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবিরের বক্তব্যে বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের জন্য যে প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাতে ঢাকা সন্তুষ্ট নয়। তবে ভবিষ্যতে ভারতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপাক্ষিক সফরের সম্ভাবনা রয়েছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

আগামী ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে বসতে যাচ্ছে ব্রিকসের ১৮তম শীর্ষ সম্মেলন। এবারের সম্মেলনের আয়োজক দেশ ভারত। বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ জোট হিসেবে পরিচিত ব্রিকসের এই সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এরই মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশের সরকারপ্রধানদের উপস্থিতিও সম্মেলনের কূটনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়েছে।

বাংলাদেশ বর্তমানে ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য নয়। তবে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিমসটেকের বর্তমান চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকার ভূমিকার কারণে এবারের সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানা গেছে। সেই আমন্ত্রণকে ঘিরেই গত কয়েকদিন ধরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নয়াদিল্লি সফর নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল।

বিশেষ করে ভারতীয় পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সফরটি হচ্ছে না বলে স্পষ্ট হয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রীর ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণ নিয়ে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তারও অবসান হয়েছে।

হুমায়ুন কবির জানিয়েছেন, ব্রিকস সম্মেলনে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশকে যে প্রক্রিয়ায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, সেটি নিয়ে ঢাকা সন্তুষ্ট নয়। ফলে প্রধানমন্ত্রী সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করে নয়াদিল্লি সফরে যাচ্ছেন না। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয়টি আলাদা এবং এ কারণে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্যের পাশাপাশি বাণিজ্য, যোগাযোগ, নদীর পানি, সীমান্ত, জ্বালানি, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক সহযোগিতাসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ফলে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে সরাসরি বৈঠক ও দ্বিপাক্ষিক সফর বরাবরই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। ব্রিকস সম্মেলনে অংশ না নিলেও ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার ইঙ্গিত সেই সম্পর্কের গুরুত্বকেই সামনে এনেছে।

ব্রিকস মূলত উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে জোটটির পরিসর ও আন্তর্জাতিক প্রভাবও বেড়েছে। সদস্য দেশগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে অংশীদার ও আমন্ত্রিত দেশগুলোর সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এবারের সম্মেলনে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাণিজ্য, উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, বহুপাক্ষিক সহযোগিতা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর স্বার্থের মতো বিষয়গুলো সম্মেলনের আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। এমন একটি আন্তর্জাতিক আয়োজনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতি নিয়ে তাই স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহ ছিল বিভিন্ন মহলে।

বাংলাদেশ ব্রিকসের সদস্য না হলেও বিমসটেকের চেয়ারম্যান হিসেবে দেশটির একটি আলাদা আঞ্চলিক অবস্থান রয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিমসটেক গুরুত্বপূর্ণ একটি প্ল্যাটফর্ম। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এ সংস্থার ভূমিকা রয়েছে। এ কারণেই ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে বাংলাদেশকে যুক্ত করার বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।

প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফর নিয়ে গত কয়েকদিনে নানা ধরনের আলোচনা হলেও সরকারি পর্যায়ে বিষয়টি নিয়ে স্পষ্টতা পাওয়া যাচ্ছিল না। ভারতের পক্ষ থেকেও বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য না থাকার কথা জানানো হয়েছিল। ফলে শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি সফরে যাচ্ছেন না—এই সিদ্ধান্তকে কূটনৈতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি অবস্থান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ব্রিকস সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্তকে দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী স্পষ্ট করেছেন, ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে যোগাযোগ ও সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থাৎ একটি বহুপাক্ষিক সম্মেলনে অংশগ্রহণের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এবং ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক—দুই বিষয়কে আলাদাভাবে দেখছে ঢাকা।

কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন সরকারপ্রধানদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও সব আমন্ত্রণের ধরন, প্রক্রিয়া এবং অংশগ্রহণের কাঠামো সমান নয়। একটি দেশের মর্যাদা, প্রতিনিধিত্বের ধরন এবং আমন্ত্রণের প্রক্রিয়া অনেক সময় কোনো দেশের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণের প্রক্রিয়া নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশের বিষয়টিও সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

অন্যদিকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ভবিষ্যতে দ্বিপাক্ষিক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হলে সেখানে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসতে পারে। বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা থেকে শুরু করে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, আন্তঃসীমান্ত যোগাযোগ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে পারে।

বিশেষ করে পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের গুরুত্ব আরও বেড়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোতে দুই দেশের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিয়মিত রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাই একদিকে যেমন একটি নির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক আয়োজনকে ঘিরে বাংলাদেশের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যোগাযোগের দরজাও খোলা রেখেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানেরই ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।

এখন নজর থাকবে ব্রিকস সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব কীভাবে হয় এবং সম্মেলনের বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো কতটা প্রতিফলিত হয়। পাশাপাশি ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর কবে এবং কোন প্রেক্ষাপটে হতে পারে, সেটিও কূটনৈতিক মহলে আগ্রহের বিষয় হয়ে থাকবে।

সব মিলিয়ে, নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশগ্রহণ নিয়ে কয়েকদিনের জল্পনার অবসান হয়েছে। আমন্ত্রণের প্রক্রিয়া নিয়ে ঢাকার অসন্তোষের কারণে তিনি সম্মেলনে যাচ্ছেন না। তবে ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে সামনে রেখে ভবিষ্যতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ব্রিকস সম্মেলনে অনুপস্থিত থাকলেও ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কের পরবর্তী কূটনৈতিক অধ্যায় কোন দিকে এগোয়, এখন সেদিকেই থাকবে সংশ্লিষ্ট মহলের নজর।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com