প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় গ্রাহকদের জন্য একাধিক সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের প্রচলিত সরকারি পেনশনের আওতায় না থাকা কর্মীদের ‘প্রগতি’ স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৮০ বছর করা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগের বিপরীতে গ্রাহকদের জন্য ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ। একই সঙ্গে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় শরিয়াহভিত্তিক বা ইসলামিক সংস্করণ চালুর উদ্যোগও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের চতুর্থ সভায় এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত ও আলোচনা হয়। অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির বর্তমান কার্যক্রম, বিনিয়োগ, গ্রাহকসেবা এবং ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ নিয়ে বিভিন্ন প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হয়। সভা শেষে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সুরাতুজ্জামান সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। সাম্প্রতিক একাধিক প্রতিবেদনের তথ্যেও এসব সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারি মালিকানাধীন কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন অনেক প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা সরাসরি সরকারি সিভিল কর্মচারীদের মতো প্রচলিত সরকারি পেনশন ও আনুতোষিক সুবিধা পান না। তাঁদের অবসরকালীন সুবিধা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের চাকরিবিধি, নিজস্ব তহবিল বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনার ওপর নির্ভর করে।
এ কারণে সরকারি মালিকানাধীন যেসব প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির কর্মীরা প্রচলিত সরকারি পেনশন সুবিধার বাইরে রয়েছেন, তাঁদের সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচির ‘প্রগতি’ স্কিমে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তটি বাস্তবায়িত হলে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন করপোরেশন, কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের এমন কর্মীদের জন্য অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তার একটি নতুন কাঠামো তৈরি হতে পারে। তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠান এর আওতায় আসবে এবং কী প্রক্রিয়ায় কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে, সে বিষয়ে পরবর্তী নির্দেশনা প্রয়োজন হবে।
গ্রাহকদের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফার হার। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ওই অর্থবছরের জন্য মুনাফার হার ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে এ হার ছিল ১১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। অর্থাৎ আগের হারের তুলনায় এবার সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পেনশন তহবিলের বিনিয়োগ কার্যক্রম, আয়-ব্যয় এবং আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে মুনাফার হার নির্ধারণ করা হয়েছে।
পেনশন ব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে বিনিয়োগের বিপরীতে মুনাফা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একজন গ্রাহক দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত চাঁদা জমা দিলে সেই অর্থ বিনিয়োগের মাধ্যমে যে আয় তৈরি হয়, তা তাঁর ভবিষ্যৎ পেনশন সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে মুনাফার হার এবং তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা গ্রাহকদের আস্থা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এদিকে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর তাঁর স্বামী বা স্ত্রীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। আগে পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর নমিনি হিসেবে স্বামী বা স্ত্রী সর্বোচ্চ ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত পেনশন সুবিধা পেতেন। এখন এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ৮০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এর ফলে কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর ওপর নির্ভরশীল স্বামী বা স্ত্রী আগের তুলনায় দীর্ঘ সময় পেনশন সুবিধা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সামাজিক নিরাপত্তার দিক থেকে এ পরিবর্তনের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। কারণ অনেক পরিবারের ক্ষেত্রে একজন সদস্যের আয় বন্ধ হয়ে গেলে পরিবারের অন্য সদস্যের আর্থিক নিরাপত্তা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে অবসরকালীন সময়ে পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যু হলে নিয়মিত পেনশন সুবিধা একজন স্বামী বা স্ত্রীর দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে সহায়ক হতে পারে। বয়সসীমা ৮০ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর ফলে সেই নিরাপত্তার সময়কালও কিছুটা দীর্ঘ হচ্ছে।
সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় ইসলামিক বা শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ চালুর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে। বর্তমানে প্রবাস, প্রগতি, সুরক্ষা ও সমতা—এই চার ধরনের স্কিম চালু রয়েছে। এগুলোর শরিয়াহভিত্তিক সংস্করণ কীভাবে পরিচালনা করা হবে, কোন ধরনের বিনিয়োগ কাঠামো অনুসরণ করা হবে এবং প্রয়োজনীয় বিধিবিধান কী হবে, সেসব বিষয় নিয়ে কাজ চলছে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পরামর্শকদের সহায়তা নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক পেনশন ব্যবস্থা চালু হলে ধর্মীয় কারণে প্রচলিত বিনিয়োগ কাঠামোতে অংশ নিতে অনাগ্রহী মানুষের জন্য আলাদা একটি বিকল্প তৈরি হতে পারে। তবে এর বাস্তব কাঠামো, বিনিয়োগ নীতি ও বিধিমালা চূড়ান্ত হওয়ার পরই এর কার্যকর রূপ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।
পেনশন পাওয়ার বয়স ৬০ বছর থেকে কমিয়ে ৫৫ বছর করার বিষয়টিও সভায় আলোচনায় এসেছে। তবে এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি নির্ধারণের আগে একচুরিয়াল বা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হবে। মানুষের গড় আয়ু, তহবিলের আর্থিক সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ দায়ের বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েই এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
অর্থাৎ ৫৫ বছর বয়সে পেনশন চালুর বিষয়টি এখনো প্রস্তাব ও আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তাই বর্তমান নিয়ম পরিবর্তন হয়ে গেছে—এমন ধারণা করার সুযোগ নেই। কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় বিধিবিধান প্রণয়নের পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান জানা যাবে।
এ ছাড়া পেনশন গ্রাহকদের বিশেষ পরিস্থিতিতে জমা অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ন্যূনতম পাঁচ বছর চাঁদা দেওয়ার পর কোনো গ্রাহক শারীরিক বা আর্থিক অক্ষমতার মতো বিশেষ পরিস্থিতিতে পড়লে নির্দিষ্ট শর্তে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। তবে এ বিষয়েও এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুনির্দিষ্ট সুপারিশসহ প্রস্তাব তৈরি করতে বলা হয়েছে।
গ্রাহক বাড়ানোর ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের সেবাকেন্দ্রগুলোকেও আরও সক্রিয় করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে পেনশন কর্মসূচিতে নতুন গ্রাহক নিবন্ধনের ক্ষেত্রে কমিশন ১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংক, ডাক বিভাগ ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসসহ অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কমিশন কাঠামো নিয়েও আলোচনা করা হয়েছে।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বাড়ানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যাওয়ার আগে কর্মীদের এ কর্মসূচি সম্পর্কে জানানো এবং নিবন্ধনের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতা নেওয়ার কথা রয়েছে। বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার সঙ্গে দেশের পেনশন ব্যবস্থাকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
এর পাশাপাশি সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার সঙ্গে স্বাস্থ্যবীমা সুবিধা যুক্ত করার সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। পেনশনভোগীদের বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপও বাড়তে পারে। সে কারণে অবসরকালীন আয়ের পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকলে একজন গ্রাহকের সামগ্রিক আর্থিক নিরাপত্তা আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে স্বাস্থ্যবীমা কোন মডেলে চালু হবে এবং এতে পেনশন তহবিলের ওপর কী ধরনের আর্থিক প্রভাব পড়বে, তা বিশ্লেষণ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভবিষ্যতে পেনশন সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘমেয়াদি পেনশন ব্যবস্থায় কয়েক দশক পর পাওয়া অর্থের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বর্তমান সময়ের তুলনায় কমে যেতে পারে। তাই মূল্যস্ফীতির বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হলেও তহবিলের আকার ও আর্থিক সক্ষমতা আরও বাড়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের সাম্প্রতিক সভায় সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও বিস্তৃত, নমনীয় ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত করার একাধিক উদ্যোগ সামনে এসেছে। কিছু সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে অনুমোদিত হয়েছে, আবার কিছু বিষয় এখনো প্রস্তাব ও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের পেনশনবঞ্চিত কর্মীদের অন্তর্ভুক্তি, ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ মুনাফা, নমিনির পেনশন পাওয়ার বয়সসীমা ৮০ বছর করা এবং শরিয়াহভিত্তিক পেনশন চালুর উদ্যোগ—এসব পরিবর্তন বাস্তবায়িত হলে দেশের পেনশন ব্যবস্থার আওতা আরও বিস্তৃত হতে পারে।
তবে এসব সুবিধার পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিধিমালা, নির্দেশনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নতুন স্কিম, অর্থ উত্তোলন, স্বাস্থ্যবীমা এবং পেনশন শুরুর বয়সসংক্রান্ত যেসব বিষয় এখনো আলোচনায় রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের আগে বিস্তারিত নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক নিরাপত্তার জন্য সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর কাঠামোয় নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত