প্রকাশ: ১৩ অক্টোবর ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে রাঙামাটির কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। একসময় দীর্ঘদিন অব্যবহৃত পড়ে থাকা পাহাড়ঘেঁষা জমিতে স্থাপিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ। উৎপাদিত এই বিদ্যুতের বাণিজ্যিক বাজারমূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সীমিত জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগিয়ে কীভাবে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির উৎপাদন বাড়ানো যায়, কাপ্তাইয়ের এই প্রকল্প তার একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হয়ে উঠেছে।
দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি, জ্বালানি আমদানির ব্যয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানিবাজারের অনিশ্চয়তার মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। প্রচলিত বিদ্যুৎ উৎপাদনে তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা থাকলেও সৌরবিদ্যুতের ক্ষেত্রে সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। ফলে উপযুক্ত পরিকল্পনা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে ভূমিকা রাখতে পারে। কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা সেই সম্ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, কাপ্তাই কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পর বাঁধের পাশে প্রায় ২২ একর জমি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে ছিল। ওই জমির ১৯ একর ব্যবহার করে প্রায় ১১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০১৯ সালে নির্মাণ করা হয় ৭ দশমিক ৪ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র। প্রকল্পটির মাধ্যমে অনাবাদি জমিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজে যুক্ত করা হয়েছে। একসময় যেখানে উৎপাদনমূলক কোনো কার্যক্রম ছিল না, সেখানে এখন সারিবদ্ধ সৌর প্যানেলের মাধ্যমে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
এই প্রকল্পের গুরুত্ব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ কিংবা আর্থিক মূল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জমির কার্যকর ব্যবহার, জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প অনুসন্ধান এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানোর সম্ভাবনাও এর সঙ্গে যুক্ত। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উপযুক্ত জমি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতা থাকলেও কাপ্তাইয়ের মতো অব্যবহৃত স্থানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা গেলে নতুন করে কৃষিজমি ব্যবহারের চাপ কিছুটা এড়ানো সম্ভব হতে পারে। তবে প্রতিটি প্রকল্পের ক্ষেত্রেই জমির উপযোগিতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ বিবেচনায় রাখা জরুরি।
কাপ্তাই কর্ণফুলী পানিবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা আরও বাড়াতে বর্তমানে একাধিক প্রকল্পের কাজ চলছে। বিদ্যমান কেন্দ্রের সঙ্গে অতিরিক্ত ১ মেগাওয়াট সক্ষমতা যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নতুন ৭ দশমিক ৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, কেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি ব্রিকফিল্ড এলাকায় আরেকটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে এবং এ প্রকল্পের দরপত্র-সংক্রান্ত প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
নতুন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে কাপ্তাই এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজ শেষ হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু এবং জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়গুলো আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির মান বজায় রাখা এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ কার্যকরভাবে গ্রিডে যুক্ত করার ওপর এ উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে।
কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী মো. জাহাঙ্গীর আলমের ভাষ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটির পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। সৌর প্যানেল পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনীয় রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করা এ ধরনের কেন্দ্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে আবহাওয়ার পরিবর্তন, মেঘলা আকাশ ও সূর্যালোকের প্রাপ্যতার কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ কমবেশি হতে পারে। তাই সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন পরিকল্পনা করার সময় আবহাওয়াজনিত পরিবর্তন এবং গ্রিড ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
সৌরবিদ্যুতের অন্যতম বড় সুবিধা হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের সময় তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো জ্বালানি সরাসরি পোড়াতে হয় না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্রে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের প্রয়োজন কমানোর সুযোগ তৈরি হয়। বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থায় দেশীয় সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানো গেলে জ্বালানি আমদানির ওপর চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর সঙ্গে সম্পর্কিত কার্বন নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রেও সৌরবিদ্যুৎ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিক বিনিয়োগ, জমির উপযোগিতা, বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো এবং যন্ত্রপাতির দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সৌর প্যানেলের উৎপাদনক্ষমতা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে, আবার প্যানেল ও অন্যান্য যন্ত্রাংশের ব্যবস্থাপনাও প্রয়োজন। তাই শুধু কেন্দ্র নির্মাণ করলেই প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত হয় না; প্রকল্পের পুরো জীবনচক্রের ব্যয়, উৎপাদনক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের নির্ভরযোগ্যতা বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে শুধু বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ, কৃষিভিত্তিক সৌরব্যবস্থা এবং পরিকল্পিত সৌর পার্কের মতো উদ্যোগও সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা ও সরকারি ভবনের ছাদে উপযোগী সৌর প্যানেল স্থাপন করলে বিদ্যুতের একটি অংশ স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করা সম্ভব। কৃষিভিত্তিক সৌর প্রকল্পের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও কৃষিকাজের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি, যাতে জ্বালানি উৎপাদনের জন্য খাদ্য উৎপাদনের জমি অপ্রয়োজনীয়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা—রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান—ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে সৌরবিদ্যুৎ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনায় আসতে পারে। এসব এলাকায় উপযুক্ত ও অব্যবহৃত জমি চিহ্নিত করে প্রকল্প নেওয়া গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, বন ও জীববৈচিত্র্য, ভূমিধসের ঝুঁকি, যোগাযোগব্যবস্থা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার ওপর সম্ভাব্য প্রভাব মূল্যায়ন না করে বড় প্রকল্প গ্রহণ করা উচিত নয়। প্রতিটি স্থানের বাস্তব পরিস্থিতি যাচাই করে পরিবেশসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করাই হবে দায়িত্বশীল পদ্ধতি।
এ ক্ষেত্রে সরকারি নীতিসহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালনব্যবস্থার উন্নয়ন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। বিনিয়োগকারীদের জন্য স্বচ্ছ নীতিমালা, প্রকল্প অনুমোদনের কার্যকর প্রক্রিয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে আগ্রহ বাড়তে পারে। পাশাপাশি উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রকৃত ব্যয় ও আর্থিক সুবিধা নিয়মিত মূল্যায়ন করা জরুরি, যাতে প্রকল্পের সাফল্য শুধু ঘোষিত সক্ষমতা দিয়ে নয়, বাস্তবে সরবরাহ করা বিদ্যুৎ ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল দিয়েও বিচার করা যায়।
কাপ্তাই সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র দেখিয়েছে, দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকা জমিও পরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় অবদান রাখতে পারে। এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়া প্রায় ৬ কোটি ৩৭ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ এবং এর আনুমানিক ৭৪ কোটি টাকার বাণিজ্যিক মূল্য প্রকল্পটির গুরুত্ব তুলে ধরে। একই সঙ্গে নতুন প্রকল্পের উদ্যোগ ভবিষ্যতে উৎপাদন আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে।
দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে একক কোনো জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎসের সমন্বিত ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। জলবিদ্যুৎ, সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য নবায়নযোগ্য উৎসকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ সঞ্চালন, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে পরিবেশ ও স্থানীয় মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে দেশের অন্যান্য উপযুক্ত স্থানেও সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প সম্প্রসারণ করা গেলে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার এবং পরিচ্ছন্ন বিদ্যুতের অংশ বাড়ানোর পথ আরও প্রশস্ত হতে পারে।
সৌরবিদ্যুতের এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রয়োজন ধারাবাহিক বিনিয়োগ, কার্যকর তদারকি এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত অঙ্গীকার। কাপ্তাইয়ের প্রকল্প সেই যাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এখন চ্যালেঞ্জ হলো এ ধরনের উদ্যোগকে বিচ্ছিন্ন সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিকল্পিতভাবে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার বৃহত্তর অংশে ছড়িয়ে দেওয়া।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত