বুধবার (২৮ অক্টোবর) রাতে টোকিওতে বাংলাদেশ দূতাবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির সফরের বিভিন্ন অর্জনের কথা তুলে ধরেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত এ সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
দুটি ঋণ প্রকল্পে জাপানের প্রতিশ্রুত অর্থের পরিমাণ ৪৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ইয়েন, যা প্রায় ২৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। তবে এটি অনুদান নয়, ঋণের প্রতিশ্রুতি। অন্যদিকে, বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা জোরদারে একটি টহল জাহাজ সরবরাহের জন্য সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ১৩ দশমিক ৪৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অনুদান দেওয়ার চুক্তি হয়েছে। অর্থাৎ ঋণ ও অনুদান—দুই ধরনের সহযোগিতাই এ সফরের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন।
জাপানের ঋণ প্রতিশ্রুতির প্রথম প্রকল্পটি বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ১৫ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ইয়েন বা ১০০ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দ্বিতীয় প্রকল্পটি উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়। এর জন্য ৩০ দশমিক ৬৮ বিলিয়ন ইয়েন বা ১৯৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপান।
বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের প্রকল্পটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে পারে। বিনিয়োগকারীদের জন্য অনুকূল ব্যবসায়িক পরিবেশ, কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রকল্পের অর্থায়ন কত দ্রুত বাস্তবায়িত হবে এবং এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীরা কী ধরনের সুবিধা পাবেন, তা নির্ভর করবে প্রকল্পের বিস্তারিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতির ওপর।
অন্যদিকে, উপজেলা পরিচালন ও উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায় স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়ন কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের উপজেলা পর্যায়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নতি এবং জনসেবার মান বাড়ানোর জন্য কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। এ অর্থায়ন সঠিকভাবে ব্যবহার করা গেলে স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সুযোগ রয়েছে।
তবে ঋণের প্রতিশ্রুতি পাওয়া এবং প্রকল্পের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানো এক বিষয় নয়। অর্থের কার্যকর ব্যবহার, স্বচ্ছতা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং ফলাফল মূল্যায়নের ওপরই নির্ভর করবে এ সহযোগিতার প্রকৃত সাফল্য।
ছয়টি সহযোগিতা দলিলের মধ্যে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশের উপকূলীয় নিরাপত্তা সক্ষমতা জোরদারে টহল জাহাজ সরবরাহের অনুদান চুক্তি। এর আওতায় সর্বোচ্চ ২ দশমিক ১২ বিলিয়ন জাপানি ইয়েন বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল এবং বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক সম্পদ দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রপথে অবৈধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ, সামুদ্রিক দুর্ঘটনায় সাড়া দেওয়া এবং দুর্যোগের সময় উদ্ধার তৎপরতা পরিচালনায় কার্যকর নৌযান ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রয়োজন। জাপানের এ সহায়তা বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, টহল জাহাজটি সামুদ্রিক অপরাধ মোকাবিলা, সামুদ্রিক দুর্ঘটনায় সাড়া দেওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করবে। তবে জাহাজটি সরবরাহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের বিস্তারিত সময়সূচি এবং অন্যান্য কারিগরি শর্ত বাস্তবায়ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
স্বাক্ষরিত দলিলগুলোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো উৎপাদনমুখী খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ। জাপানের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার ও ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নবিষয়ক একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
এ ছাড়া জাপানের কৃষি, বন ও মৎস্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পৃথক সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। এর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন, প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময়, বিনিয়োগ এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে সক্ষমতা উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাত বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। উন্নত উৎপাদনপ্রযুক্তি, মানসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং দক্ষতা বৃদ্ধির উদ্যোগ এ খাতগুলোর উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। তবে সহযোগিতার সুফল নিশ্চিত করতে হলে মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ব্যবহার এবং সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ হবে।
দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির কর্মসূচি বা এমপ্লয়মেন্ট ফর স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (ইএসডিপি) নিয়েও একটি সহযোগিতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জাপানের শ্রমবাজারে কাজের উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে এ উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতা, পেশাগত প্রশিক্ষণ, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে জ্ঞান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশিক্ষণ কার্যক্রম যথাযথভাবে পরিচালিত হলে কর্মীরা আরও প্রস্তুত হয়ে বিদেশে কাজের সুযোগ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে দক্ষ জনশক্তি তৈরি দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প ও সেবা খাতের জন্যও ইতিবাচক হতে পারে।
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা এবং নদীভাঙনের মতো সমস্যা মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত সহায়তা, অভিযোজন পরিকল্পনা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রেক্ষাপটে জাপানের পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সহযোগিতা জোরদারে একটি আগ্রহপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ দলিলের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে পরিবেশ ও জলবায়ুসংশ্লিষ্ট সহযোগিতা সম্প্রসারণের পথ তৈরি হয়েছে।
তবে আগ্রহপত্র স্বাক্ষরকে নির্দিষ্ট প্রকল্পের অর্থায়ন বা বাস্তবায়ন শুরুর সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়। ভবিষ্যতে কোন কোন ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে, কী ধরনের প্রযুক্তিগত সহায়তা পাওয়া যাবে এবং বাস্তবায়নের দায়িত্ব কীভাবে বণ্টিত হবে, তা পরবর্তী কার্যক্রমের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
সরকারি পর্যায়ের ছয়টি সহযোগিতা দলিলের বাইরে জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে দুই দেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আরও ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির। এর মাধ্যমে সরকারি সহযোগিতার পাশাপাশি বেসরকারি খাতেও অর্থনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে ২৭ অক্টোবরের শীর্ষ বৈঠকের পর প্রকাশিত জাপানের সরকারি বিবৃতিতে আগামী পাঁচ বছরে জাপানি কোম্পানিগুলোর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রত্যাশার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি দুই দেশের অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব জোরদার এবং বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হলে উৎপাদনশিল্প, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে সমঝোতা স্মারক বা বিনিয়োগের আগ্রহের ঘোষণা মানেই নির্ধারিত পরিমাণ অর্থ ইতিমধ্যে বিনিয়োগ হয়ে গেছে—এমন নয়। প্রকৃত বিনিয়োগের পরিমাণ, সময়সূচি এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
টোকিওতে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে জাপানের আগ্রহ রয়েছে। সফরকালে জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশনের (জেবিআইসি) গভর্নরের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।
জাপানের সরকারি বিবৃতিতেও দুই দেশের সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প ও যোগাযোগ সহযোগিতাকে আরও বিস্তৃত করার উদ্যোগও আলোচনায় এসেছে। এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য এবং বিনিয়োগের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
সব মিলিয়ে, প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে ঋণের প্রতিশ্রুতি, অনুদান চুক্তি, সরকারি সহযোগিতা দলিল এবং বেসরকারি খাতের সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করেছে। তবে এসব উদ্যোগের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে বাস্তবায়নের ফলাফলে। ঋণের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার, বিনিয়োগের বাস্তব রূপায়ণ, দক্ষ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের এই অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থবহ হয়ে উঠবে।
স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত