প্রকাশ: ২২ সেপ্টেম্বর’ ২০২৫ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক, একটি বাংলাদেশ অনলাইন
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) দীর্ঘ ৩২০ দিন নিষিদ্ধ থাকার পর পুনরায় ছাত্ররাজনীতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। তবে নতুন করে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে কিছু কড়াকড়ি শর্ত আরোপ করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার সৈয়দ ছলিম মোহাম্মদ স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে সোমবার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্ররাজনীতি নতুনভাবে যাত্রা শুরু করল, যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন আগ্রহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে, তেমনি নানা প্রশ্নও উত্থাপন করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গত ১৮ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল কমিটির সাথে সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনের এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ছাত্ররাজনীতি পুনর্বহালের বিষয়ে সর্বসম্মত সুপারিশ গৃহীত হয়। তারই আলোকে গত বছরের ৬ নভেম্বর থেকে চলমান নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা হয়েছে। যদিও পুনরায় কার্যক্রম শুরু হলেও তা সম্পূর্ণ শর্তসাপেক্ষ। শিক্ষার্থীদের কল্যাণমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের অনুমোদনক্রমে পরিচালনা করা যাবে। অন্যদিকে ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অক্ষুণ্ণ রাখতে একাডেমিক ভবন, প্রশাসনিক ভবন ও আবাসিক হলে পূর্বের মতো সভা, সমাবেশ ও মিছিল আয়োজন নিষিদ্ধ থাকবে।
এই বিজ্ঞপ্তিতে আরো উল্লেখ করা হয়, সামনে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচনের জন্য প্যানেল গঠন ও প্রার্থীদের পরিচিতিমূলক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যাবে, তবে সেসব কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট হল প্রশাসনের অনুমতি সাপেক্ষে হবে। অর্থাৎ ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালু হলেও তার পরিসর নিয়ন্ত্রিত এবং প্রশাসনিক তত্ত্বাবধানে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে।
শাবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ৬ নভেম্বর। মূলত একাধিক সহিংস ঘটনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এই কঠোর পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে সংঘর্ষ ও অরাজকতা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছিল। এর ফলে প্রশাসন সাময়িকভাবে সকল রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রায় এক বছর ধরে রাজনৈতিক শূন্যতায় শিক্ষার্থীরা একধরনের অচলাবস্থার মধ্যে থাকলেও এ সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রম তুলনামূলক স্বাভাবিকভাবে চলেছে।
তবে দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন যে, এভাবে ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা তাদের নেতৃত্ব বিকাশ ও গণতান্ত্রিক চর্চার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে ও বাইরে থেকে এ নিয়ে নানা আলোচনা সমালোচনা হয়। বিশেষ করে ছাত্রসংগঠনগুলো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে নিয়মিত আন্দোলন চালিয়ে আসছিল। সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে প্রশাসন অবশেষে নতুন শর্ত আরোপ করে রাজনীতি চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালুর ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নেতৃত্ব, সংগঠনশক্তি ও সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি পায়। তারা বিশ্বাস করেন যে, নতুন প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা দায়িত্বশীলভাবে রাজনীতিতে অংশ নেবেন এবং ক্যাম্পাসকে গণতান্ত্রিক চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে গড়ে তুলবেন।
অন্যদিকে একাংশ শিক্ষার্থী শঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী ছাত্ররাজনীতি প্রায়ই সহিংসতা, বিভক্তি এবং অরাজকতা ডেকে আনে। তারা আশঙ্কা করছেন, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়লে ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ আবারও নষ্ট হতে পারে। তাই তারা চান প্রশাসন কঠোরভাবে শর্তাবলি মেনে চলার বিষয়টি নিশ্চিত করুক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, তারা ছাত্ররাজনীতিকে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবেই পুনর্বহাল করেছে। তবে এ কার্যক্রম যেনো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি না ঘটায়, সেদিকে কড়া নজর রাখা হবে। প্রক্টরিয়াল কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম আয়োজন করা যাবে না। এ ছাড়া হল ও একাডেমিক ভবনের ভেতরে মিছিল বা সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকার বিষয়টিও প্রশাসন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে চায়।
প্রশাসনের এই অবস্থান থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তারা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত আকারে সীমিত রাখতে চায়। অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা রাজনীতিতে যুক্ত হতে পারবেন, তবে তা অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ব্যাহত না করে করতে হবে।
শাবিপ্রবির ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালু হওয়ায় এখন সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আসন্ন বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) নির্বাচন। দীর্ঘদিন ধরে এ নির্বাচন হয়নি। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকায় এ বিষয়ে কোনো অগ্রগতি ছিল না। এবার প্রশাসনের অনুমোদনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনগুলো নতুন করে প্যানেল গঠনে সক্রিয় হয়ে উঠবে।
শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, শাকসু নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং প্রতিযোগিতামূলক। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন তাদের পরিকল্পনা সাজাচ্ছে। ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে প্রশাসন জানিয়েছে, শাকসু নির্বাচন সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ও স্বচ্ছ করার জন্য সবধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হবে।
শাবিপ্রবিতে ছাত্ররাজনীতি পুনরায় চালুর সিদ্ধান্ত জাতীয় পর্যায়েও তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় রাজনীতির অনিবার্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উঠে আসা ছাত্রনেতারা পরবর্তীতে জাতীয় নেতৃত্বেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে সমালোচনা বেড়েছে। সহিংসতা, সন্ত্রাস, সেশনজট ও একাডেমিক পরিবেশ বিনষ্ট হওয়ার অভিযোগে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্ন উঠেছে এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। শাবিপ্রবি যেভাবে শর্তসাপেক্ষে ছাত্ররাজনীতি চালু করেছে, তা দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্যও দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে। যদি এ মডেল সফল হয়, তবে একদিকে শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক চর্চার সুযোগ পাবেন, অন্যদিকে একাডেমিক পরিবেশও অক্ষুণ্ণ থাকবে।
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি পুনর্বহাল হওয়া নিঃসন্দেহে একটি বড় ঘটনা। প্রায় এক বছরের বিরতির পর শিক্ষার্থীরা আবারও রাজনৈতিক কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। তবে প্রশাসনের আরোপিত শর্তাবলি এবং তদারকি এ প্রক্রিয়াকে অনেকটাই সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত করেছে। এর সফলতা নির্ভর করবে শিক্ষার্থীদের পরিপক্বতা, ছাত্র সংগঠনগুলোর দায়িত্বশীলতা এবং প্রশাসনের নিরপেক্ষ ভূমিকার ওপর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতি শুধু একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরের বিষয় নয়, বরং বৃহত্তর জাতীয় রাজনীতিরও অংশ। তাই শাবিপ্রবির অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে দেশজুড়ে ছাত্ররাজনীতির ধরণ-ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। এখন দেখার বিষয়, শিক্ষার্থীরা কতটা ইতিবাচক ও শান্তিপূর্ণভাবে এই সুযোগকে কাজে লাগাতে পারেন এবং প্রশাসন কতটা সফলভাবে শর্ত মেনে ক্যাম্পাসে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখতে সক্ষম হন।